চীন সরকার ২০২৪ সালে তিব্বতে ব্রহ্মপুত্র (ইয়ারলুং স্যাংপো) নদীর ওপর নতুন একটি বিশাল বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। এই প্রকল্পের স্থান অরুণাচল প্রদেশের সীমান্তের কাছে, যেখানে নদী চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল থেকে প্রবাহিত হয়। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এই উদ্যোগকে কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
২০০৩ সালে ইয়াংজি নদীর ওপর বিশ্বের সর্ববৃহৎ ‘থ্রি গর্জেস’ বাঁধের উদ্বোধন চীনের জলবিদ্যুৎ ক্ষমতা বাড়িয়ে দিয়েছিল। নতুন বাঁধের নকশা ও প্রযুক্তি একই রকম, তবে আয়তনে তা প্রায় তিন গুণ বড় হওয়ার কথা। চীনা প্রকৌশল দল এটিকে “গ্রেট বেন্ড” নামে পরিচিত করেছে এবং তিব্বতের উচ্চভূমিতে, প্রায় ৫০ কিলোমিটার উপরে একটি তীক্ষ্ণ ঢালু স্থানে স্থাপন করা হবে।
প্রকল্পের মোট ব্যয় ১৬,৮০০ কোটি ডলার নির্ধারিত হয়েছে, যা চীনের দীর্ঘমেয়াদী শক্তি কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচিত। সম্পন্ন হলে বাঁধটি প্রায় ৬০,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে, যা চীনের বিদ্যুৎ ঘাটতি পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই পরিমাণের শক্তি চীনের বিদ্যুৎ গ্রিডে সরাসরি সংযুক্ত হবে এবং দেশের শিল্প ও নগরায়ণকে সমর্থন করবে।
শি জিনপিং ২০২৪ সালের গোড়ার দিকে তিব্বতে সফর করেন এবং উচ্চভূমিতে অবস্থিত এই প্রকল্পের দ্রুত সম্পন্নের নির্দেশ দেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, জাতীয় স্বার্থের জন্য প্রকৌশলগত কাজগুলোকে পদ্ধতিগতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। এই বক্তব্যের পর থেকে চীনের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো নির্মাণের ত্বরান্বিত সূচি প্রকাশ করেছে।
অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু এই পরিকল্পনাকে “জল বোমা” বলে সমালোচনা করেন এবং ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে বিষয়টি ত্বরিতভাবে বিবেচনা করার আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন যে, বাঁধের নির্মাণে নদীর প্রবাহে বড় পরিবর্তন আসবে, যা নিম্নমুখী ভারতীয় অঞ্চলের বন্যা ও কৃষি উৎপাদনে গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ইতিমধ্যে এই উদ্বেগকে উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে এবং কূটনৈতিক চ্যানেলগুলির মাধ্যমে চীনের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক আলোচনার সূচনা হয়নি, যা দুই দেশের মধ্যে জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে চলমান উত্তেজনাকে বাড়িয়ে তুলছে।
ব্রহ্মপুত্রের এই নতুন বাঁধের নির্মাণ দুই পারমাণবিক ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিবেশীর মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। পূর্বে চীন ও ভারত নদী ব্যবস্থাপনা, সীমান্ত সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে পারস্পরিক অবিশ্বাসের মুখোমুখি হয়েছে। নতুন বাঁধের ফলে উভয় দেশের কূটনৈতিক মঞ্চে জল নিরাপত্তা, পরিবেশগত প্রভাব এবং শেয়ার্ড রিসোর্সের ন্যায্য বণ্টন নিয়ে তীব্র বিতর্কের সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে।
আঞ্চলিক পর্যায়ে, তিব্বত-চীন-ভারত ত্রিভুজে অবস্থিত এই প্রকল্পটি আন্তর্জাতিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই নদীকে কেন্দ্র করে পূর্বে নেপাল, বংলাদেশ এবং চীনও বিভিন্ন হাইড্রোইলেকট্রিক প্রকল্পে যুক্ত হয়েছে, যা প্রত্যেক দেশের স্বার্থের সংঘাতের সূত্রপাত করেছে।
একজন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, “বড় পরিসরের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো নদীর প্রবাহে পরিবর্তন আনে, যা নিম্নমুখী দেশগুলোর জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। সুতরাং, সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে চুক্তি না হলে জলসম্পদ নিয়ে সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়ে।” এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, চীনের নতুন বাঁধ প্রকল্পটি কেবল শক্তি উৎপাদনের নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
পরবর্তী কয়েক মাসে চীন প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করেছে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে অনুমোদন প্রক্রিয়া চালু করবে। একই সঙ্গে, ভারতীয় সরকারও তিব্বতে বাঁধের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন শুরু করেছে। উভয় দেশের কূটনৈতিক মঞ্চে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সূচনা হলে, ভবিষ্যতে সীমান্তে শান্তিপূর্ণ সমঝোতা ও যৌথ ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
ব্রহ্মপুত্রের এই নতুন বাঁধের নির্মাণের ফলে তিব্বত-চীন-ভারত ত্রিভুজে জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত সুরক্ষা এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন দিক উন্মোচিত হবে। উভয় দেশের নীতি নির্ধারক ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এই প্রকল্পটি পর্যবেক্ষণযোগ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে দাঁড়াবে।



