ঢাকা, ২২ ডিসেম্বর – মব সন্ত্রাস, ধ্বংস, অগ্নিকাণ্ড ও হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে জাতীয় স্তরে প্রতিবাদ জানাতে, ‘জুলাই সাংস্কৃতিক আন্দোলন’ আজ সন্ধ্যায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির ১ নম্বর গেটের সামনে ‘সংস্কৃতিই প্রতিবাদের শ্রেষ্ঠতম ভাষা’ শীর্ষক একটি সাংস্কৃতিক ও আলোচনা সভা আয়োজন করে। অনুষ্ঠানটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সম্প্রতি ঘটিত সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত হয়।
গত কয়েক মাসে মবের আক্রমণ, সম্পত্তি ধ্বংস, অগ্নিসংযোগ এবং অনিয়মিত হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বেড়েছে, ফলে সাধারণ মানুষ, শ্রমিক ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে। সরকার ও সমাজের বিভিন্ন স্তরে এই ঘটনাগুলোর নিন্দা করা হলেও, বাস্তবিক পদক্ষেপের অভাব নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে, সাংস্কৃতিক কর্মী ও সামাজিক কর্মীরা সংস্কৃতির মাধ্যমে প্রতিবাদকে শব্দ ও রূপ দিতে চেয়েছেন।
অনুষ্ঠানের সূচনায় সাম্প্রতিক সহিংসতায় প্রাণ হারানো শহীদ শরিফ ওসমান হাদি, শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাস এবং শিশু আয়েশার স্মরণে এক মুহূর্তের নীরবতা রাখা হয়। তাদের আত্মত্যাগকে সম্মান জানিয়ে, উপস্থিত সবাই তাদের নাম উচ্চারণ করে এবং শোকের গান গেয়ে শোক প্রকাশ করে। এই শ্রদ্ধা নিবেদনটি মব সন্ত্রাসের শিকারদের প্রতি সমবেদনা ও ন্যায়বিচারের আহ্বান হিসেবে তুলে ধরা হয়।
আয়োজকরা উল্লেখ করেন, সংস্কৃতি কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং সমাজে ন্যায়, মানবিকতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার শক্তিশালী হাতিয়ার। তারা বিশ্বাস করেন, শিল্পের বহুমাত্রিক প্রকাশের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সশক্ত প্রতিবাদ গড়ে তোলা সম্ভব। এ কারণেই ‘সংস্কৃতিই প্রতিবাদের শ্রেষ্ঠতম ভাষা’ শিরোনামে এই সমাবেশের মূল উদ্দেশ্য নির্ধারিত হয়েছে।
অনুষ্ঠানে ‘জুলাই সাংস্কৃতিক আন্দোলনের’ সভাপতি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সাংস্কৃতিক সম্পাদক সালাউদ্দিন জামিল সৌরভ তার বক্তব্যে সংস্কৃতির ভূমিকা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সংস্কৃতি কেবল আনন্দের সঙ্গী নয়, এটি মানুষের চেতনা জাগিয়ে তোলার শক্তিশালী উপকরণ। ইতিহাসের প্রতিটি গণআন্দোলন ও প্রতিবাদী লড়াইতে সংস্কৃতি মানুষের কণ্ঠকে সাহস ও ভাষা দিয়েছে, এ কথাটি তিনি জোর দিয়ে বলেন।
সৌরভ আরও উল্লেখ করেন, অন্যায়, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে সংস্কৃতি মানুষের অন্তর্নিহিত মানবিকতাকে জাগিয়ে তুলতে পারে। তিনি আহ্বান জানান, সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে একটি সচেতন, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন করা উচিত। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, অনুষ্ঠানটি শুধুমাত্র শিল্পের প্রদর্শনী নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তনের একটি মঞ্চ হিসেবে কাজ করেছে।
অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে সমসাময়িক সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সংস্কৃতির শক্তি ও প্রতিবাদের ভাষা নিয়ে আলোচনা করা হয়। এরপর বিভিন্ন শিল্পী গীত, কবিতা পাঠ এবং মূকাভিনয় উপস্থাপন করেন, যেখানে প্রতিটি রচনায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের সুর স্পষ্টভাবে শোনা যায়। এই বহুমুখী পরিবেশনা দর্শকদের মধ্যে গভীর প্রভাব ফেলেছে এবং প্রতিবাদের বার্তা শক্তিশালী করেছে।
অনুষ্ঠানে শিল্পকলা একাডেমি, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংস্থা, শিক্ষার্থী, শ্রমিক এবং সাধারণ নাগরিকসহ বিস্তৃত শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। উপস্থিতির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ছিল, যা মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সমন্বিত প্রতিবাদের প্রতি জনমতের তীব্রতা প্রকাশ করে। অংশগ্রহণকারীরা একত্রে সংস্কৃতির মাধ্যমে ন্যায়বিচার ও মানবিকতার পক্ষে সুর তুলতে সক্ষম হয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এ ধরনের সাংস্কৃতিক সমাবেশের মাধ্যমে জনমত গঠনে নতুন দিক উন্মোচিত হতে পারে এবং সরকারকে ন্যায়সঙ্গত পদক্ষেপ নিতে চাপ সৃষ্টি হতে পারে। ভবিষ্যতে, এ ধরনের উদ্যোগের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে, মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আইনগত ও সামাজিক কাঠামো শক্তিশালী হতে পারে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা বৃদ্ধি পাবে।
সারসংক্ষেপে, ‘সংস্কৃতিই প্রতিবাদের শ্রেষ্ঠতম ভাষা’ অনুষ্ঠানটি মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ হিসেবে রূপ নেয়, যেখানে শোক, সৃজনশীলতা এবং সামাজিক দায়িত্বের মিশ্রণ দেখা যায়। এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন স্তরে ন্যায়বিচার, মানবিকতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।



