কিয়েভে রাশিয়ার বায়ু হামলা বাড়তে থাকায় শহরের বাসিন্দারা রাতের সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার মুখোমুখি হচ্ছেন। ২০২২ সালে পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে মোট ১,৮০০ের বেশি আকাশীয় আক্রমণ রেকর্ড হয়েছে। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।
রাশিয়া প্রতি আক্রমণে শত শত ড্রোন এবং কয়েক দশটি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে। ড্রোনগুলো রাতের অন্ধকারে গর্জন করে, আর ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আকাশকে জ্বালিয়ে দেয়। এই অস্ত্রগুলো একসঙ্গে কাজ করে শহরের অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করে, যার ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহে ধারাবাহিক বাধা সৃষ্টি হয়।
আক্রমণগুলো সাধারণত অন্ধকারের পরেই শুরু হয় এবং প্রায়শই ভোর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। একাধিক তরঙ্গের আকারে আকাশে গর্জন শোনা যায়, যা নাগরিকদের ঘুমকে ব্যাহত করে। বিস্ফোরণের গর্জন এবং ড্রোনের গুঞ্জন একসঙ্গে শহরের রাত্রিকালীন পরিবেশকে ভয়াবহ করে তুলেছে।
বিস্ফোরণগুলোর ধাক্কা বাড়িগুলোকে নাড়া দেয়, কিছু ক্ষেত্রে কাঠামোগত ক্ষতি ঘটায়। নাগরিকরা তীব্র অড্রেনালিনের স্রোতে ভুগে, কখনো কখনো ঘরে কম্পন অনুভব করে। কয়েক ঘণ্টা পর মস্তিষ্কের ক্লান্তি বাড়ি থেকে বেরিয়ে ঘুমিয়ে পড়ার কারণ হয়, যদিও স্বপ্নে আক্রমণের গর্জন অব্যাহত থাকে।
সকালে বিদ্যুৎ ফিরে এলে মানুষ শারীরিক ও মানসিক ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় থাকে। যদিও বড় কোনো প্রাণহানি রেকর্ড হয়নি, তবু বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে এবং বহু অ্যাপার্টমেন্টের দেয়াল ও জানালায় ক্ষতি হয়েছে। এই ধরণের ক্ষতি শহরের পুনর্নির্মাণ ও মানবিক সহায়তার চাহিদা বাড়িয়ে তুলেছে।
একটি দীর্ঘ ও জোরালো আক্রমণের পর, কিয়েভের একটি পাড়ায় উচ্চ বিদ্যালয়ের স্নাতকরা প্রমের পর সূর্যোদয়ের দিকে হাঁটতে দেখা যায়। তাদের হাসি ও উল্লাস রাতের অন্ধকারকে ভাঙে, যদিও আশেপাশে ধ্বংসাবশেষের ছাপ রয়ে যায়। এই দৃশ্যটি শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে আশা ও দৃঢ়তার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।
ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র চালনা করা সৈন্যদের ব্যক্তিগত জীবনের কথা কখনো কখনো ভাবা হয়, তবে বাস্তবিকভাবে এই অস্ত্রগুলো নাগরিক জীবনে যে ভয় ও অস্থিরতা নিয়ে আসে, তা অধিকতর স্পষ্ট। যুদ্ধের এই দিকটি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করা জরুরি।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার এই আক্রমণকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে নিন্দা করেছে এবং ইউক্রেনকে অতিরিক্ত সামরিক ও মানবিক সহায়তা প্রদান করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। বিশ্লেষকরা বলেন, রাশিয়ার লক্ষ্য হল দীর্ঘমেয়াদী চাপের মাধ্যমে ইউক্রেনের প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস করা।
এ ধরনের বায়ু হামলা পূর্বে গাজা ও সিরিয়ার কিছু অঞ্চলে দেখা গেছে, যেখানে একইভাবে নাগরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে দীর্ঘ সময়ের জন্য বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এই তুলনা রাশিয়ার কৌশলকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নীতির আলোকে মূল্যায়নের সুযোগ দেয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে, ইউক্রেনের সরকার ও আন্তর্জাতিক অংশীদাররা পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। রাশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনার সময়সূচি ও শর্তাবলী নির্ধারণে বহু দেশ যুক্ত হয়েছে। বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, যদি শর্তসাপেক্ষে যুদ্ধবিরতি অর্জিত হয়, তবে বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে।
সামগ্রিকভাবে, কিয়েভে বায়ু হামলা ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা নাগরিক জীবনের প্রতিটি স্তরে প্রভাব ফেলছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এই সংকটের সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ভবিষ্যতে শান্তি ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার সুষ্ঠু বাস্তবায়নই একমাত্র স্থায়ী সমাধান হতে পারে।



