২০২৫ সালে বিশ্ব আর্থিক বাজারে স্বর্ণের দাম সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে, একই সঙ্গে মার্কিন ডলার প্রায় দশ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, তেল মূল্য প্রায় সতেরো শতাংশ কমেছে এবং উচ্চ ঝুঁকির জাঙ্ক বন্ডের দাম উল্টো দিকে উঁচু হয়েছে। এই পরিবর্তনগুলোকে প্রভাবিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনরায় শাসন, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য অনিশ্চিত পরিবেশ তৈরি করেছে।
এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রের টারিফ নীতি নিয়ে সৃষ্ট ‘লিবারেশন ডে’ শক থেকে বিশ্ব শেয়ারবাজার দ্রুত পুনরুদ্ধার দেখিয়েছে। বছরের শেষ নাগাদ শেয়ারবাজারে প্রায় বিশ শতাংশের অতিরিক্ত বৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়েছে, যা ধারাবাহিক ছয় বছর ধরে দ্বি-অঙ্কের লাভের ধারাকে বজায় রেখেছে এবং সাম্প্রতিক সাত বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ অর্জন।
বাজারের অস্থিরতার মাঝেও স্বর্ণের চাহিদা বাড়ার ফলে দাম ১৯৭৯ সালের পর সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি এড়াতে স্বর্ণকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিয়েছেন, যা তার মূল্যের তীব্র উত্থানে ভূমিকা রেখেছে।
মার্কিন ডলার, যা দীর্ঘদিনের বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে কাজ করে, এই বছর প্রায় দশ শতাংশের কাছাকাছি অবমূল্যায়ন দেখেছে। ডলারের পতন ইউরো, ইয়েন এবং অন্যান্য প্রধান মুদ্রার তুলনায় তার ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের সূচক।
তেলের দামের হ্রাসও উল্লেখযোগ্য, যেখানে গ্লোবাল তেল বাজারে প্রায় সতেরো শতাংশের পতন রেকর্ড হয়েছে। সরবরাহের অতিরিক্ততা এবং চাহিদার ধীরগতি এই হ্রাসের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ ঋণবাজারে, উচ্চ ফলনযুক্ত জাঙ্ক বন্ডের দাম বিপরীতমুখী গতিতে উঁচু হয়েছে। যদিও এই বন্ডগুলো সাধারণত অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে বিক্রি হয়, তবু বিনিয়োগকারীরা এখনো উচ্চ রিটার্নের আকর্ষণে এগুলোতে প্রবেশ করছেন।
প্রযুক্তি সেক্টরে, ‘ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন’ নামে পরিচিত প্রধান সাতটি যুক্তরাষ্ট্রের টেক জায়ান্টের শেয়ার মূল্য সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা কমে গেছে। বিশেষ করে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ক্ষেত্রে অগ্রগামী নভিডিয়া অক্টোবর মাসে প্রথমবারের মতো পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার মূলধন অর্জন করলেও, সামগ্রিকভাবে টেক শেয়ারগুলোর ঝলকানি হ্রাস পেয়েছে।
ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারেও বড় পরিবর্তন ঘটেছে; বিটকয়েনের মূল্য এই বছর প্রায় এক তৃতীয়াংশ হ্রাস পেয়েছে। ডিজিটাল মুদ্রার এই পতন বাজারের অস্থিরতা এবং নিয়ন্ত্রক নীতির অনিশ্চয়তার ফলে ত্বরান্বিত হয়েছে।
ডাবললাইন ফান্ডের ম্যানেজার বিল ক্যাম্পবেল ২০২৫কে ‘পরিবর্তনের বছর’ এবং ‘আশ্চর্যের বছর’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে বাণিজ্য যুদ্ধ, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং ঋণ সমস্যার পারস্পরিক প্রভাবই এই বছরের মূল চালিকাশক্তি।
এই সব সূচক একত্রে বিনিয়োগকারীদের জন্য জটিল চিত্র তৈরি করেছে। ডলার ও তেলের অবমূল্যায়ন মুদ্রা ও পণ্য বাজারে নতুন ভারসাম্য সৃষ্টি করতে পারে, আর স্বর্ণের উত্থান নিরাপদ সম্পদে প্রবেশের ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে জাঙ্ক বন্ডের উত্থান উচ্চ রিটার্নের সন্ধানে ঝুঁকি গ্রহণের প্রবণতা নির্দেশ করে।
টেক সেক্টরের মন্দা এবং বিটকয়েনের পতন ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে সতর্কতা বাড়িয়ে দিয়েছে। বিনিয়োগকারীদের এখনো বৈচিত্র্যপূর্ণ পোর্টফোলিও গঠন, মুদ্রা ও পণ্যের দিক থেকে সুরক্ষা, এবং ঋণ বাজারের গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
ভবিষ্যৎ দৃষ্টিতে, বাণিজ্য নীতি, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক ঋণ স্তরের পরিবর্তন বাজারের অস্থিরতাকে বাড়িয়ে তুলতে পারে। তাই আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও কৌশলগত পুনর্বিন্যাস অপরিহার্য হয়ে দাঁড়াবে।
সারসংক্ষেপে, ২০২৫ সালের আর্থিক দৃশ্যপট স্বর্ণের উজ্জ্বলতা, ডলার ও তেলের পতন, জাঙ্ক বন্ডের উত্থান এবং টেক ও ক্রিপ্টো সম্পদের মন্দা দ্বারা চিহ্নিত। এই মিশ্র পরিস্থিতি বিনিয়োগকারীদেরকে সতর্কতা, নমনীয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বাজারে পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানায়।



