গত বৃহস্পতিবার রাতের দিকে ঢাকা শহরের দুইটি প্রধান সংবাদমাধ্যমের অফিসে ধ্বংসাত্মক হামলা চালানো হয়। প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার দুটোই ভাঙচুর, চুরি এবং অগ্নিকাণ্ডের শিকার হয়। এই ঘটনা দেশের প্রেসস্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগকে আবার তীব্র করে তুলেছে।
হামলায় গৃহীত হিংসা ও ধ্বংসের পেছনে অজানা গোষ্ঠীর দায়িত্ব নেওয়া হয়েছে, তবে এখন পর্যন্ত কোনো গ্রুপের নাম প্রকাশিত হয়নি। ঘটনাস্থলে অগ্নিকাণ্ডের ফলে কিছু অংশ জ্বলে গিয়ে কাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে, এবং অফিসের ভিতরে থাকা কিছু সরঞ্জাম ও নথি চুরি হয়েছে।
হামলার পরপরই রাজনৈতিক নেতারা, সাংবাদিক সংস্থা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এবং আন্তর্জাতিক প্রেস সংস্থাগুলো থেকে তীব্র নিন্দা জানানো হয়। দেশীয় ও বিদেশি পর্যায়ে এই ধরনের সহিংসতা গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করার প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বড়ো আইনজীবী ও গনো ফোরামের প্রাক্তন সভাপতি ড. কামাল হোসেন ঘটনাস্থলে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অফিসগুলো পরিদর্শন করেন। তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে বলেন, মিডিয়া অফিসে আগুন জ্বালানো ও ধ্বংস করা জনগণ ও রাষ্ট্রের স্বার্থের বিরোধী কাজ।
ড. কামাল আরও জানান, এ ধরনের সংগঠিত হিংসা গণতন্ত্র, সংবাদস্বাধীনতা এবং জননিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করে। সরকার যদি এই শক্তিকে থামাতে ব্যর্থ হয়, তবে দেশের নিরাপত্তা নিজেই বিপন্ন হতে পারে।
প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার দেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও শাসনের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, এ কথাটিও ড. কামাল জোর দিয়ে বলেন। সরকার যদি এই মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে তা অগ্রহণযোগ্য।
হামলাকে স্বাধীন সাংবাদিকতাকে নীরব করার এবং সমালোচনামূলক কণ্ঠস্বর দমন করার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ড. কামাল ব্যাখ্যা করেন। তিনি অতীতের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে, যেমন ছায়ানাট ও উডিচিতে, সংঘটিত হামলাগুলোকেও একই ধারায় যুক্ত করে দেখান।
এই ধারাবাহিক আক্রমণগুলোকে দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর পুনরাবৃত্তি করা আক্রমণ হিসেবে চিহ্নিত করে, ড. কামাল জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানান। তিনি সকলকে একত্রে এই হিংস্র শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে আহ্বান জানান।
ড. কামালকে গনো ফোরামের অন্যান্য জ্যেষ্ঠ নেতারা সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে গনোসামহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। জোনায়েদ উল্লেখ করেন, গণতন্ত্রে মিডিয়ার সমালোচনা স্বাভাবিক, তবে হিংসা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, মানুষ মিডিয়ার সমালোচনা করতে পারে বা বিকল্প প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে পারে, তবে অফিসে আগুন জ্বালিয়ে ভয় ছড়ানো কখনোই সঠিক নয়। এই ধরনের কাজ সমাজে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করে এবং প্রকাশের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করে।
হামলার পটভূমিতে সাম্প্রতিক সময়ে শারিফ ওসমান হাদি, জুলাই ফ্রন্টের একজন মুখপাত্রের হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি রয়েছে, যা মিডিয়ার ওপর আক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। এই ঘটনাগুলো একসাথে মিডিয়া নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।
অন্তর্জাতিক প্রেস সংস্থাগুলোও এই হামলাকে নিন্দা জানিয়ে বাংলাদেশের সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানিয়েছে। তারা জোর দিয়ে বলছে, সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত না করা হলে দেশের আন্তর্জাতিক সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
পরবর্তী সময়ে সরকার কী ধরনের আইনগত বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, তা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলবে। মিডিয়া সংস্থাগুলোও নিরাপত্তা বাড়াতে অতিরিক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের পরিকল্পনা করছে। এই ঘটনাগুলো দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বাস্থ্যের সূচক হিসেবে বিবেচিত হবে।
সামগ্রিকভাবে, প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের অফিসে সংঘটিত ধ্বংসযজ্ঞ দেশের প্রেসস্বাধীনতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উদ্ভাসিত হয়েছে। সরকার, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই ধরনের হিংসা পুনরাবৃত্তি রোধ করা কঠিন হবে।



