যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি তৃতীয় ত্রৈমাসিকে শক্তিশালী গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে প্রাথমিক অনুমান প্রকাশিত হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক জিডিপি অনুমান অনুযায়ী, এই বৃদ্ধি মূলত ভোক্তা ব্যয় এবং ব্যবসায়িক বিনিয়োগের ত্বরান্বিত হওয়ার ফলে হয়েছে। তবে জীবনের ব্যয় বৃদ্ধি এবং সাম্প্রতিক সরকারী বন্ধের প্রভাবের ফলে গতি ধীর হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন।
ভোক্তা ব্যয়ের উত্থান বিশেষ করে গাড়ি শিল্পে স্পষ্ট, যেখানে সেপ্টেম্বরের শেষের আগে বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য কর ক্রেডিটের মেয়াদ শেষ হওয়ায় ক্রেতারা ত্বরিত ক্রয় করেছে। এই ত্বরিত ক্রয় গৃহস্থালির ব্যয়কে ত্বরান্বিত করে সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতি বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে, ব্যবসায়িক বিনিয়োগের পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা উৎপাদনশীলতা ও ভবিষ্যৎ বৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডেটা অনুযায়ী, তৃতীয় ত্রৈমাসিকে আমদানি হ্রাস পেয়েছে, যা বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে ভূমিকা রেখেছে। কম আমদানি অর্থনীতিতে আয়তনীয় চাপ কমিয়ে জিডিপি বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে। এই প্রবণতা পূর্বের ত্রৈমাসিকের তুলনায় আরও সুস্পষ্ট, যেখানে আমদানি হ্রাসের ফলে ঘাটতি সংকুচিত হয়েছে।
তবে, এই ডেটা ৪৩ দিনের সরকারী বন্ধের কারণে দেরি হয়েছে এবং এখন পুরনো তথ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বন্ধের সময়ে অনেক সরকারি সংস্থা কাজ বন্ধ রাখে, ফলে অর্থনৈতিক সূচকগুলোর প্রকাশে বিলম্ব ঘটে। এই দেরি ডেটার সময়োপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, তবে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন যে মূল প্রবণতা তেমন পরিবর্তন হবে না।
অর্থনীতিবিদরা এখন ‘কে-আকৃতির’ অর্থনীতির ধারণা তুলে ধরছেন, যেখানে উচ্চ আয়ের গৃহস্থালিগুলো তুলনামূলকভাবে সমৃদ্ধ, আর মধ্য ও নিম্ন আয়ের গৃহস্থালিগুলো আর্থিকভাবে সংকটে রয়েছে। এই কাঠামোতে উচ্চ আয়ের গৃহস্থালিগুলো স্টক মার্কেটের উত্থান ও সম্পদ বৃদ্ধি থেকে উপকৃত হচ্ছে, ফলে তাদের ব্যয় ক্ষমতা বাড়ছে। অন্যদিকে, নিম্ন আয়ের গৃহস্থালিগুলো মুদ্রাস্ফীতি ও বাস্তব মজুরির হ্রাসের মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
সার্ভে অনুযায়ী, ভোক্তা ব্যয়ের মূল চালিকাশক্তি এখন উচ্চ আয়ের গৃহস্থালিগুলো। শেয়ারবাজারের উত্থান তাদের সম্পদকে বাড়িয়ে তুলেছে, ফলে তারা আরও ব্যয় করতে সক্ষম হয়েছে। তবে এই ব্যয় বৃদ্ধি সমগ্র অর্থনীতির জন্য সমানভাবে উপকারী নয়, কারণ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের গোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতা সীমিত রয়ে গেছে।
বড় কর্পোরেশনগুলো ট্রাম্পের ট্যারিফ নীতির প্রভাবকে সামাল দিতে সক্ষম হয়েছে। যদিও ট্যারিফের ফলে খরচ বাড়ে, তবে এই প্রতিষ্ঠানগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়িয়ে উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতা শক্তিশালী করছে। এআইতে বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত করতে পারে।
অন্যদিকে, ছোট ও মাঝারি আকারের ব্যবসাগুলো ট্যারিফের ফলে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। উচ্চতর কাঁচামাল খরচ এবং সীমিত আর্থিক সম্পদ তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ফলে এই সেক্টরে কর্মসংস্থান ও আয় স্থিতিশীলতা হ্রাসের ঝুঁকি দেখা দিচ্ছে।
বস্টন কলেজের অর্থনীতিবিদ ব্রায়ান বেথুনের মতে, ত্রৈমাসিকটি সামগ্রিকভাবে ভাল ছিল, তবে চতুর্থ ত্রৈমাসিকে একই রকম গতি বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। গৃহস্থালির বাজেট সংকুচিত হচ্ছে, এবং বাস্তব মজুরির বৃদ্ধির তুলনায় ব্যয়ের চাপ বাড়ছে। ফলে গড় গৃহস্থালি আর্থিকভাবে কেবলমাত্র টিকে থাকার পর্যায়ে রয়েছে।
রয়টার্সের অর্থনীতিবিদদের সমীক্ষা অনুযায়ী, তৃতীয় ত্রৈমাসিকে জিডিপি বার্ষিকীকৃত হারে প্রায় ৩.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের ৩.৮ শতাংশ বৃদ্ধির তুলনায় সামান্য কম, তবে এখনও শক্তিশালী বৃদ্ধি হিসেবে বিবেচিত। এই সংখ্যা সরকারী ডেটা প্রকাশের আগে অনুমানভিত্তিক, তবে বাজারের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সংসদীয় বাজেট অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সরকারী বন্ধের প্রভাব চতুর্থ ত্রৈমাসিকে জিডিপিতে ১.০ থেকে ২.০ শতাংশ পয়েন্টের ক্ষতি ঘটাতে পারে। এই সম্ভাব্য হ্রাস অর্থনৈতিক গতি ধীর করার পাশাপাশি, বিনিয়োগ ও ভোক্তা আস্থার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সারসংক্ষেপে, যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় ত্রৈমাসিকের জিডিপি বৃদ্ধি শক্তিশালী হলেও, উচ্চ আয়ের গৃহস্থালির ব্যয় বৃদ্ধির ওপর নির্ভরশীলতা এবং সরকারী বন্ধের পরিণতি ভবিষ্যৎ গতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। নীতি নির্ধারকদের জন্য এই বৈষম্যপূর্ণ প্রবণতা মোকাবেলা করা এবং ছোট ব্যবসার সহায়তা নিশ্চিত করা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মূল চাবিকাঠি হবে।



