২৩ বছর বয়সী কৃষক আহমেদ জোবায়ের ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে রাজশাহীর মোহনপুর, ধুরইল ইউনিয়নের বড় পালশা গ্রামে তার নিজের ধানের মাঠে কাজ করার সময় এক্সকাভেটরের নিচে ধসে মারা যান। তিনি অননুমোদিত পুকুর খননের বিরোধে প্রতিবাদ করার সময় এই দুর্ঘটনায় নিহত হন।
আহমেদ জোবায়ের পুরো পরিবার ও গ্রামের মানুষ তাকে ধানের মাঠের রক্ষক হিসেবে জানে। তিনি নিজের জমিতে সারা বছর ধান চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন এবং প্রতিবেশী জমির মালিকদের অতিরিক্ত পুকুর নির্মাণের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে প্রতিবাদ করতেন।
অননুমোদিত পুকুর নির্মাণের কাজ চলাকালে, পুকুরের খননযন্ত্রের চালক জোবায়েরকে সরিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। তবে জোবায়ের তার কাজ থামাতে দৃঢ় ছিলেন, ফলে খননযন্ত্রের হাইড্রোলিক প্রেসের নিচে তিনি ধসে গিয়ে গুরুতর আঘাত পেয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
এই পুকুরগুলো মূলত শহুরে জমির মালিকদের দ্বারা মাছ চাষের জন্য তৈরি করা হচ্ছে। জমির মালিকরা পুকুরের মাধ্যমে কর সুবিধা ও নগদ অগ্রিম পেতে সক্ষম, যদিও কোনো পরিমাপ বা অনুমোদন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় না। ফলে কৃষকরা তাদের শস্যের উৎপাদন ও আয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব অনুভব করছেন।
অবৈধ পুকুরের বিস্তার ধানক্ষেত্রের জলাবদ্ধতা বাড়িয়ে তুলেছে। জমির মালিকদের দাবি অনুযায়ী, তারা যেকোনো পরিমাণে পানি জমিয়ে রাখতে পারে, ফলে শস্যের সেচের জন্য প্রয়োজনীয় সময়ে জমি পানিতে ডুবে যায়। এই পরিস্থিতি কৃষকদের তিন ফসলের চক্রকে ব্যাহত করেছে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তার মতে, মোহনপুরের অধিকাংশ কৃষিজমি তিন ফসলের জন্য উপযুক্ত, তবে অনিয়ন্ত্রিত পুকুরের কারণে বর্তমানে প্রায় ৩০০ বিঘা জমি স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধ। এই জলাবদ্ধ জমিতে শস্য চাষ করা সম্ভব নয়, ফলে কৃষকরা শীতকালে শস্য, গম, বিন, রসুন ইত্যাদি চাষের সুযোগ হারাচ্ছেন।
কৃষকরা জানান, পূর্বে বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে (ডিসেম্বর-জানুয়ারি) তারা শস্য, গম, বিন, রসুনসহ বিভিন্ন শীতকালীন ফসল চাষ করতেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শত শত অননুমোদিত পুকুরের নির্মাণের ফলে এই চক্র ভেঙে পড়েছে এবং উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে।
আহমেদের মৃত্যুর পরপরই গ্রামের মানুষ ও কৃষক সমিতি ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে স্থানীয় আদালতে প্রতিবাদ রেলি চালায়। তারা দ্রুত ন্যায়বিচার ও সংশ্লিষ্ট দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি চায়। প্রতিবাদকারীরা আদালতে লিখিত স্মারকলিপি জমা দিয়ে এক্সকাভেটরের চালক ও পুকুর নির্মাণের অনুমোদনকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের দাবি জানায়।
স্থানীয় পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে প্রাথমিক তদন্ত চালিয়ে এক্সকাভেটরের চালক ও পুকুর নির্মাণে জড়িত কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে। ঘটনাটির আইনি দায়িত্ব নির্ধারণের জন্য ফৌজদারি রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে এবং মামলার ফাইল জেলা আদালতে পাঠানো হয়েছে।
প্রতিবাদকারীরা জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে মামলার শোনার তারিখে উপস্থিত হয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে চায়। তারা এছাড়াও সরকারকে অননুমোদিত পুকুর নির্মাণের বিরুদ্ধে কঠোর নিয়মাবলী প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছে, যাতে কৃষিজমি রক্ষা পায় এবং কৃষকদের আয় সুরক্ষিত থাকে।
এই ঘটনার পর, রাজশাহী জেলার কৃষি ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছে যে, অননুমোদিত পুকুর নির্মাণের জন্য জরুরি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে এবং বিদ্যমান পুকুরগুলোর পুনঃমূল্যায়ন করা হবে। একই সঙ্গে, কৃষকদের ক্ষতিপূরণ ও পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা তৈরির জন্য বিশেষ কর্মসূচি গঠন করা হবে।



