অন্তর্বর্তী সরকার আগামী অর্থবছরের বাজেটের প্রাথমিক রূপরেখা তৈরি ও চলতি বাজেটের সংশোধন নিয়ে ২২ ডিসেম্বর একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক আয়োজন করেছে। বৈঠকটি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারি বাসভবন, যমুনা রোডে অনুষ্ঠিত হয় এবং এতে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ. মনসুরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অংশ নেন। বৈঠকের মূল লক্ষ্য হল ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের কাঠামো নির্ধারণ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের সংশোধিত প্রস্তাবনা চূড়ান্ত করা।
বৈঠকে প্রথমে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ৭.৯০ লাখ কোটি টাকা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। প্রাথমিকভাবে বাজেটের এই পরিমাণকে ৭.৭০ লাখ কোটি টাকায় কমানোর পরিকল্পনা ছিল, তবে পাঁচটি ইসলামি ধারার ব্যাংককে একীভূতকরণে আর্থিক সহায়তা এবং সরকারি কর্মচারীদের কিছু সুবিধা প্রদান করার ফলে সংশোধিত বাজেটে উল্লেখযোগ্য কাটছাঁট না-ও হতে পারে। শেষ পর্যন্ত সংশোধিত বাজেটের আকার ৭.৮৮ থেকে ৭.৯০ লাখ কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আরেকটি মূল সিদ্ধান্ত হল রাজস্ব বাজেটের আকার বৃদ্ধি করা। প্রাথমিক রূপরেখা অনুসারে, আগামী অর্থবছরে রাজস্ব বাজেটের প্রস্তাবিত পরিমাণ ৫.৬০ লাখ কোটি টাকা, যা পূর্বের বাজেটের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। এই বৃদ্ধি মূলত কর সংগ্রহের লক্ষ্য এবং অবকাঠামো প্রকল্পের তহবিল নিশ্চিত করার জন্য পরিকল্পিত। একই সঙ্গে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) এর আকারে সামান্য হ্রাসের সম্ভাবনা রয়েছে; প্রাথমিকভাবে ২.৫০ লাখ কোটি টাকা নির্ধারিত এডিপি, আলোচনা শেষে ২.৩০ থেকে ২.৫০ লাখ কোটি টাকার মধ্যে সমন্বয় হতে পারে।
বাজেটের মোট আকারের প্রাথমিক রূপরেখা ৮.০৫ লাখ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে এডিপি ২.৫০ লাখ কোটি টাকা অন্তর্ভুক্ত। তবে বৈঠকে আলোচনার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে এই সংখ্যা বৃদ্ধি বা হ্রাস পেতে পারে। বিশেষত, রাজস্ব বাজেটের সম্প্রসারণ এবং এডিপি কমানোর সমন্বয় কীভাবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক সেবার ওপর প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে বিশদ আলোচনা হবে।
বিপক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, প্রধান বিরোধী দলগুলো বাজেটের এই কাঠামোকে সমালোচনা করেছে। তারা উল্লেখ করে যে রাজস্ব বাজেটের অতিরিক্ত বৃদ্ধি করের বোঝা সাধারণ জনগণের ওপর বাড়িয়ে দিতে পারে, আর এডিপি হ্রাসের ফলে অবকাঠামো ও সামাজিক প্রকল্পের অগ্রগতি ধীর হতে পারে। বিরোধীরা দাবি করে যে নতুন সরকারকে বাজেটের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি দরিদ্র ও মাঝারি আয়ের পরিবারের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক তহবিল নিশ্চিত করতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকার এই উদ্বেগের প্রতি সাড়া দিয়ে জানিয়েছে যে বাজেটের রূপরেখা কেবল একটি প্রাথমিক খসড়া এবং নতুন নির্বাচিত সরকারকে প্রয়োজন অনুসারে সংশোধন ও পরিমার্জনের সুযোগ থাকবে। এভাবে, নির্বাচনের পর নতুন সরকার বাজেটের আকার ও কাঠামো পুনর্বিবেচনা করে দেশের আর্থিক অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা নিতে পারবে।
বাজেটের এই প্রাথমিক রূপরেখা এবং সংশোধিত প্রস্তাবনা দেশের অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষত, রাজস্ব বাজেটের বৃদ্ধি এবং এডিপি হ্রাসের সমন্বয় কীভাবে মুদ্রাস্ফীতি, বিনিয়োগ এবং সামাজিক কল্যাণে প্রভাব ফেলবে, তা পরবর্তী পর্যায়ে বিশ্লেষণ করা হবে। সরকার ও বিরোধী দল উভয়েরই লক্ষ্য হল অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে জনসেবা উন্নত করা, তবে তাদের পদ্ধতি ও অগ্রাধিকার ভিন্ন হতে পারে।
বৈঠকের পরবর্তী ধাপ হিসেবে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো রূপরেখা অনুযায়ী বিশদ বাজেট নথি প্রস্তুত করবে এবং তা সংসদে উপস্থাপন করবে। সংসদীয় আলোচনা এবং নতুন সরকারের গঠন শেষে বাজেটের চূড়ান্ত রূপ নির্ধারিত হবে। এ প্রক্রিয়ায় সকল স্টেকহোল্ডারদের মতামত ও পরামর্শ বিবেচনা করা হবে, যাতে দেশের আর্থিক নীতি জনগণের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।



