মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের যুদ্ধের উদ্দেশ্য এখনও পুরো ইউক্রেন এবং প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ হিসেবে বিবেচিত ভূখণ্ড পুনরায় দখল করা। এই দৃষ্টিভঙ্গি যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ স্তরের বিশ্লেষকদের ছয়টি স্বতন্ত্র সূত্রের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে এবং যুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে চলমান আলোচনার পরেও অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।
গোয়েন্দা তথ্যের মতে, পুতিনের কৌশলগত লক্ষ্য কেবল ইউক্রেন নয়, বরং পূর্ব ইউরোপের বেশ কিছু দেশ, যার মধ্যে ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্রের অংশও অন্তর্ভুক্ত। এই দাবি ইউক্রেনের আক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে এবং ইউরোপীয় নেতাদের ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার মতামতের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার শান্তি আলোচনায় অংশগ্রহণকারী দলগুলো পুতিনকে সংঘাতের সমাপ্তি কামনা করছেন বলে দাবি করে আসছে। ট্রাম্পের দল এই অবস্থানকে আন্তর্জাতিক আলোচনার একটি মূল শর্ত হিসেবে উপস্থাপন করেছে, তবে গোয়েন্দা বিশ্লেষণ এই দৃষ্টিভঙ্গার সঙ্গে বিরোধপূর্ণ বলে নির্দেশ করেছে।
২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে আক্রমণ শুরু করার পর থেকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়ন ধারাবাহিকভাবে একই রকম রয়ে গেছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর সরকার ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোও পুতিনের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যকে একইভাবে ব্যাখ্যা করেছে, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিবেশে উদ্বেগের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশেষ করে, পুতিনের পরিকল্পনা কেবল ইউক্রেনের সীমা পুনর্গঠন নয়; তিনি প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্যান্য দেশ, এমনকি ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্রের কিছু অংশ পুনরায় যুক্ত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। এই ধরনের দাবি রাশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে পুনর্গঠন করার বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হাউস গোয়েন্দা কমিটির ডেমোক্র্যাটিক সদস্য মাইক কুইগলি এই বিশ্লেষণকে উল্লেখ করে বলেছেন, ইউরোপীয় দেশগুলো পুতিনের অতিরিক্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে স্পষ্টভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। পোল্যান্ডের সরকার পুরোপুরি নিশ্চিত যে রাশিয়া বৃহত্তর আক্রমণ পরিকল্পনা করছে, আর বাল্টিক দেশগুলো নিজেদেরকে প্রথম লক্ষ্য হিসেবে দেখছে।
বর্তমানে রাশিয়া ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ ভূখণ্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। এর মধ্যে ডনবাসের লুহানস্ক ও দোনেৎস্কের বড় অংশ, জাপোরিজিয়া ও খেরসনের কিছু এলাকা, এবং ক্রাইমিয়া উপদ্বীপ অন্তর্ভুক্ত। এই অঞ্চলগুলো রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতি ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
পুতিন ক্রাইমিয়া এবং উপরে উল্লেখিত চারটি অঞ্চলের স্বীকৃতি রাশিয়ার অংশ হিসেবে দিয়েছেন। তিনি এই ভূখণ্ডগুলোকে আন্তর্জাতিকভাবে রাশিয়ার অংশ হিসেবে দাবি করে চলেছেন, যদিও অধিকাংশ দেশ এই দাবিকে স্বীকৃতি দেয়নি।
শান্তি আলোচনার অংশ হিসেবে, ট্রাম্পের দল কিয়েভকে দোনেৎস্কের কিছু ছোট ইউক্রেনীয় নিয়ন্ত্রিত এলাকায় থেকে সেনা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দিচ্ছে বলে দুই সূত্র জানিয়েছে। এই প্রস্তাবটি একটি বৃহত্তর চুক্তির অংশ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে, যার লক্ষ্য যুদ্ধের তীব্রতা কমিয়ে আনা।
তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কি এবং দেশের অধিকাংশ নাগরিক এই ধরনের শর্ত গ্রহণে অনিচ্ছুক। জেলেনস্কি ও তার সরকার রাশিয়ার দাবিগুলোকে অগ্রহণযোগ্য বলে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং সম্পূর্ণ ভূখণ্ডের স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন যে, যুদ্ধের সমাপ্তি নিয়ে আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এবং বর্তমান শান্তি চুক্তি পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে নিকটবর্তী। তবে তিনি গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ না করে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, যদি পুতিনের বিস্তৃত ভূখণ্ড পুনর্দখল করার ইচ্ছা বাস্তবায়িত হয়, তবে ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আসবে এবং ন্যাটো সদস্য দেশগুলোকে নতুন কৌশলগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি উদ্যোগের সাফল্যও রাশিয়ার প্রকৃত লক্ষ্য নির্ধারণের ওপর নির্ভরশীল হবে। ভবিষ্যতে এই দ্বিমুখী দৃষ্টিভঙ্গি কিভাবে সমন্বিত হবে, তা আন্তর্জাতিক রাজনীতির মূল প্রশ্ন হিসেবে রয়ে যাবে।



