রাশিয়ার সামরিক বাহিনী ইউক্রেনের দক্ষিণে অবস্থিত ওদেসা অঞ্চলে সাম্প্রতিক সপ্তাহে ধারাবাহিক আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। এই হামলায় বিদ্যুৎ সরবরাহে ব্যাপক বিঘ্ন, বন্দর সুবিধার ক্ষতি এবং বেশ কয়েকজনের প্রাণহানি ঘটেছে। আক্রমণগুলো বিশেষভাবে সামুদ্রিক লজিস্টিকসকে লক্ষ্য করে, যা দেশের রপ্তানি ও অভ্যন্তরীণ সরবরাহ শৃঙ্খলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
উক্রেনের উপ-প্রধানমন্ত্রী ওলেকসি কুলেবা উল্লেখ করেছেন, মস্কো এই অঞ্চলে পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি সতর্ক করেন, যুদ্ধের মূল কেন্দ্র এখন ওদেসার দিকে স্থানান্তরিত হয়েছে। একই সময়ে রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির জেলেনস্কি জানান, রাশিয়ার এই ধারাবাহিক আক্রমণগুলো ইউক্রেনের সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা সীমাবদ্ধ করার উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে।
ওদেসা বন্দর এলাকায় সোমবার সন্ধ্যায় একটি আক্রমণ ঘটে, যেখানে একটি বেসামরিক জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্থানীয় গভর্নর জানিয়েছেন। বন্দর অবকাঠামোর ওপর আঘাতের ফলে ময়দা ও ভোজ্য তেলসহ কয়েক ডজন কন্টেইনার ধ্বংস হয়েছে। এই ধ্বংসাবশেষের ফলে বন্দর কার্যক্রমে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটেছে এবং আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোর রুট পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হয়েছে।
বিবিসি সূত্রে জানানো হয়েছে, রাশিয়ার আক্রমণগুলো একাধিকবার বিদ্যুৎ সরবরাহকে বাধাগ্রস্ত করেছে। রোববার রাতে ঘটিত বিস্ফোরণের ফলে প্রায় এক লক্ষ বিশ হাজার বাসিন্দার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। বিদ্যুৎ ঘাটতি কয়েক দিন ধরে অব্যাহত রয়েছে, যা স্থানীয় ব্যবসা ও গৃহস্থালির দৈনন্দিন কার্যক্রমকে প্রভাবিত করছে।
গত সপ্তাহে পিভদেন্নি বন্দরকে লক্ষ্য করে একটি দূরপাল্লা ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আটজন নিহত এবং কমপক্ষে ত্রিশজন আহত হয়েছেন। একই সময়ে, একটি গাড়িতে তিন সন্তানসহ এক নারী নিহত হন; এই ঘটনার ফলে ওদেসা অঞ্চলের একমাত্র ইউক্রেন-মলদোভার সংযোগকারী সেতুটি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এই ধারাবাহিক সাইবার ও শারীরিক আক্রমণগুলো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সপ্তাহের শেষের দিকে, ইউক্রেনের সামরিক কমান্ডার দমিত্রো কারপেনকোকে পদত্যাগের আদেশ দেওয়া হয় এবং শীঘ্রই নতুন বিমান বাহিনীর কমান্ডার নিযুক্ত করার পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়। এই পদক্ষেপটি রাশিয়ার বায়ু আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা কাঠামোকে পুনর্গঠন করার একটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ওদেসা বন্দর ইউক্রেনের অর্থনীতিতে কেবল তৃতীয় বৃহত্তম শহর নয়, বরং গম ও ভুট্টা রপ্তানির প্রধান হাবও। জাপোরিজঝিয়া, খেরসন ও মাইকোলাইভের অন্যান্য বন্দর রাশিয়ার দখলে পড়ার পর, ওদেসা এখন দেশের জন্য কৌশলগতভাবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক শস্য বাজারে ইউক্রেনের শীর্ষস্থানীয় রপ্তানিকারক অবস্থান বজায় রাখতে এই বন্দরটি অপরিহার্য।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, রাশিয়ার “শ্যাডো ফ্লিট” নামে পরিচিত নৌবহরের ট্যাংকারে ইউক্রেনের ড্রোন আক্রমণ বাড়ার ফলে রাশিয়া ব্ল্যাক সি-তে ইউক্রেনের নৌগমনের ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপের হুমকি দিয়েছে। ভ্লাদিমির পুতিনের সাম্প্রতিক মন্তব্যে এই হুমকি স্পষ্ট হয়েছে, যেখানে তিনি বলেছিলেন, রাশিয়া যদি প্রয়োজনবোধ করে তবে ব্ল্যাক সি-তে ইউক্রেনের প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে পারে।
ভবিষ্যৎ দিকে নজর দিলে, ওদেসা অঞ্চলে বিদ্যুৎ পুনরুদ্ধার, বন্দর অবকাঠামোর মেরামত এবং সেতু পুনরায় চালু করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে, রাশিয়ার সামরিক কৌশল ও দখলকৃত অঞ্চলের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া ইউক্রেনের কূটনৈতিক আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে রয়ে যাবে। এই প্রেক্ষাপটে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো দেশগুলো ওদেসা বন্দরকে রক্ষা করার জন্য অতিরিক্ত সামরিক ও মানবিক সহায়তা প্রদান করার ইঙ্গিত দিয়েছে, যা অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও শস্য রপ্তানির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।



