গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের কোস্টগার্ড ভেনেজুয়েলা উপকূলের আন্তর্জাতিক জলসীমায় আরেকটি তেল ট্যাঙ্কার আটক করে, যা চীনের দিকে চলছিল। এই জব্দের পর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়েন আন্তর্জাতিক আইনকে ‘গুরুতর লঙ্ঘন’ বলে সমালোচনা করেন। ঘটনাটি ভেনেজুয়েলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান নিষেধাজ্ঞা বিরোধের নতুন পর্যায় চিহ্নিত করে।
যুক্তরাষ্ট্রের কোস্টগার্ডের মতে, আটক করা জাহাজটি ভেনেজুয়েলা থেকে চীনের পথে ১.৮ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বহন করছিল। নথিপত্রে দেখা যায় জাহাজটি ‘সেঞ্চুরিজ’ নামে রেজিস্টার করা হলেও ‘ক্র্যাগ’ নামের মিথ্যা পতাকায় চলছিল, যা আন্তর্জাতিক শিপ রেজিস্ট্রেশন নিয়মের লঙ্ঘন নির্দেশ করে।
এই তেলের ক্রেতা হিসেবে মধ্যস্থতাকারী কোম্পানি সাতাউ তিজানা অয়েল ট্রেডিং উল্লেখ করা হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানটি ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা পিডিভিএসএ (PDVSA) থেকে তেল সংগ্রহ করে চীনের স্বাধীন শোধনাগারে সরবরাহের কাজ করে। তাই এই জাহাজের চালান সরাসরি চীনের তেল চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত হতে চলেছিল।
হোয়াইট হাউজের এক মুখপাত্র জোর দিয়ে বলেছেন যে, আটক করা জাহাজটি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা তেল বহন করছিল এবং এটি ভেনেজুয়েলার গোপন তেল বহরের অংশ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক শিপিং নিরাপত্তা ও নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
ভেনেজুয়েলা সরকার এই জব্দকে ‘গুরুতর আন্তর্জাতিক জলদস্যুতা’ বলে অভিহিত করে, এবং যুক্তরাষ্ট্রের কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন লঙ্ঘন হিসেবে সমালোচনা করেছে। ভেনেজুয়েলা কর্তৃপক্ষ জোর দিয়ে বলেছেন যে, দেশের তেল রপ্তানি অধিকার রক্ষা করা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মৌলিক নীতি।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের ‘একতরফা ও অবৈধ’ নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে, এবং ভেনেজুয়েলার অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। লিন জিয়েন উল্লেখ করেছেন, চীন সব ধরনের একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক স্বায়ত্তশাসন রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন।
চীন এই মুহূর্তে ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেলের সর্ববৃহৎ ক্রেতা, এবং দেশের মোট তেল আমদানি থেকে প্রায় চার শতাংশ ভেনেজুয়েলা থেকে আসে। তাই ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি চীনের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, এবং এই ধরনের জব্দ চীনের সরবরাহ শৃঙ্খলে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক দুইটি ট্যাঙ্কার জব্দের পেছনে ভেনেজুয়েলা-চীন তেল বাণিজ্যের ওপর চাপ বাড়ানোর কৌশল থাকতে পারে। তবে একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন ও নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থার মধ্যে জটিলতা বাড়িয়ে তুলছে, যা ভবিষ্যতে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার প্রয়োজনীয়তা বাড়াবে।
এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি যুক্তরাষ্ট্রের সমুদ্রবিধি প্রয়োগের বৈধতা ও চীনের কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়ার দিকে স্থানান্তরিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের ফলে ভেনেজুয়েলা-চীন তেল চুক্তির পুনর্বিবেচনা, অথবা নতুন নিষেধাজ্ঞা কাঠামোর সম্ভাবনা উন্মোচিত হতে পারে।
পরবর্তী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়ই উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিরসনের চেষ্টা করবে বলে আশা করা যায়। একই সঙ্গে ভেনেজুয়েলা আন্তর্জাতিক সমুদ্রে তার তেল বহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত রক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সম্ভাবনা প্রকাশ করেছে। এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক আইন, বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা একসঙ্গে গড়ে তুলবে ভবিষ্যতের সমুদ্র নীতি।



