পাকিস্তান এবং চীন লিবিয়ার পূর্বাঞ্চল নিয়ন্ত্রণকারী জেনারেল খলিফা হাফতারের নেতৃত্বাধীন লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (LNA) সঙ্গে ৪০০ কোটি ডলারেরও বেশি মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম চুক্তি সম্পন্ন করেছে। চুক্তি অনুযায়ী হাফতারের বাহিনী ১৬টি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান এবং ১২টি সুপার মুশাক প্রশিক্ষণ বিমান পাবেন, পাশাপাশি স্থল, সমুদ্র ও আকাশপথের বিভিন্ন সরঞ্জাম সরবরাহ করা হবে।
চুক্তি কার্যকর হলে তেলসমৃদ্ধ উত্তর আফ্রিকান দেশ লিবিয়ার সামরিক শক্তির ভারসাম্য উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হতে পারে। বর্তমানে হাফতারের বাহিনী পূর্বে নিয়ন্ত্রণে থাকলেও, দেশের পশ্চিমে জাতিসংঘ স্বীকৃত সরকার ট্রিপোলিতে প্রধানমন্ত্রী আবদুল হামিদ দিবেইবা নেতৃত্বে রয়েছে। দুই শাসন কাঠামোর মধ্যে সামরিক ক্ষমতার পার্থক্য এই চুক্তিকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
গত সপ্তাহে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির বেনগাজি সফরের সময় হাফতারের পুত্র সাদ্দামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ঐ সাক্ষাতে উভয় পক্ষের মধ্যে অস্ত্র চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। মুনির হাফতারের বাহিনীর জন্য শক্তি বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়ে বলেন, “সশস্ত্র বাহিনীই রাষ্ট্রের অস্তিত্বের ভিত্তি”।
রয়টার্সের হাতে থাকা চুক্তির খসড়া অনুযায়ী, হাফতারের বাহিনী জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান এবং সুপার মুশাক প্রশিক্ষণ বিমানের পাশাপাশি পাইলট প্রশিক্ষণও পাবে। পাকিস্তানি কর্মকর্তারা জানান, চুক্তির বাস্তবায়ন প্রায় আড়াই বছর সময় নেবে এবং এতে ভূমি, সমুদ্র ও আকাশপথের বিস্তৃত সামরিক সরঞ্জাম অন্তর্ভুক্ত থাকবে। মোট মূল্য সর্বোচ্চ ৪.৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা পাকিস্তানের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ অস্ত্র রপ্তানি চুক্তি হিসেবে বিবেচিত হবে।
বর্তমানে হাফতারের বাহিনী বা ট্রিপোলির সরকার উভয়েরই উল্লেখযোগ্য আকাশবাহিনী নেই। এই চুক্তি উভয় পক্ষের জন্য প্রথমবারের মতো আধুনিক যোদ্ধা বিমান অর্জনের সুযোগ এনে দেবে, যা লিবিয়ার আকাশপথের ক্ষমতা বাড়াবে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর নতুন প্রভাব ফেলতে পারে।
২০১৯ সালে হাফতারের ত্রিপোলি দখলের প্রচেষ্টা সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, মিশর ও রাশিয়ার সমর্থনে ব্যর্থ হয়। তুরস্ক তখন ত্রিপোলি-ভিত্তিক সরকারকে রক্ষা করতে ভাড়াটে যোদ্ধা ও টিবি২ ড্রোন পাঠায় এবং পরবর্তীতে পশ্চিমে হাজার হাজার সৈন্য মোতায়েন করে, পাশাপাশি বিতর্কিত সামুদ্রিক চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই ঐতিহাসিক পটভূমি বর্তমান চুক্তির কূটনৈতিক গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে।
জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ২০২১ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর দিবেইবা প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হলেও নির্বাচনী প্রক্রিয়া এখনও সম্পন্ন হয়নি। তার শাসনামলে তিনি ট্রিপোলি-নিয়ন্ত্রিত মিলিশিয়াদের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করে নিয়েছেন, যা দেশের অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, পাকিস্তান-চীন যৌথ সরবরাহ লিবিয়ার সামরিক দৃশ্যপটকে পুনর্গঠন করতে পারে এবং হাফতারের পূর্বাঞ্চলীয় শাসনকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে, ট্রিপোলি সরকারকে নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে, বিশেষত আকাশপথে সমতা বজায় রাখতে।
আঞ্চলিক পর্যবেক্ষকরা চুক্তির বাস্তবায়ন পর্যায়ে সম্ভাব্য বাধা ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো লিবিয়ার রাজনৈতিক সমাধানের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, এবং এই ধরনের বড় অস্ত্র চুক্তি তাদের শান্তি প্রক্রিয়ার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
পাকিস্তানের জন্য এই চুক্তি তার রপ্তানি বাজারের বৈচিত্র্য বাড়াবে এবং চীনের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা আরও দৃঢ় করবে। চীন-পাকিস্তান যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে লিবিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোতে নতুন শক্তি প্রবেশের ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় শক্তি গতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে।
পরবর্তী কয়েক মাসে চুক্তির প্রথম সরবরাহের সূচনা হবে, যা হাফতারের বাহিনীর প্রশিক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে সম্পন্ন হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর থাকবে এই সরবরাহের গতি ও পরিসরের ওপর, এবং লিবিয়ার অভ্যন্তরীণ সংঘাতের সম্ভাব্য উত্তেজনা কমাতে বা বাড়াতে এই সরঞ্জামগুলোর ভূমিকা কী হবে তা নির্ধারণে।
সারসংক্ষেপে, পাকিস্তান ও চীন লিবিয়ার হাফতারকে ৪০০ কোটি ডলারেরও বেশি মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যা লিবিয়ার সামরিক ভারসাম্যকে পুনর্গঠন করতে পারে এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক গতিবিধিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে।



