কানাডা সরকার সোমবার মার্ক ওয়াইজম্যানকে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন দূত হিসেবে ঘোষণায় আনুষ্ঠানিকভাবে নিযুক্ত করেছে। ওয়াইজম্যান পূর্বে ব্ল্যাকরক কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহী পদে ছিলেন এবং তার দায়িত্বে থাকবে কানাডা‑যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সামগ্রিক তদারকি, বিশেষত বাণিজ্য ও শুল্ক বিষয়ক আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়া। এই নিয়োগের সময়সীমা এমন একটি পর্যায়ে পড়ে যেখানে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক উত্তেজনা পুনরায় তীব্র হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এই নিয়োগের মাধ্যমে কানাডার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে স্থিতিশীল করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে ওয়াইজম্যানের অভিজ্ঞতা ও কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি কানাডার সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। দূতের কাজের মধ্যে থাকবে উভয় দেশের শীর্ষ নীতি নির্ধারকদের সঙ্গে সমন্বয় করে পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা করা।
কানাডা‑যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক নীতির ফলে উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডার ওপর একাধিক রাউন্ড শুল্ক আরোপ করেন, যার মধ্যে ২৫ শতাংশের একটি সমগ্র শুল্ক অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন ও ফেন্টানিল প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগে আরোপিত হয়েছিল।
তবে পরিসংখ্যান দেখায় যে কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র সীমান্ত পার হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা ফেন্টানিলের পরিমাণ সামগ্রিক মোটের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। এই তথ্যের পরেও ট্রাম্প প্রশাসন ফেন্টানিল সংক্রান্ত অভিযোগকে ভিত্তি করে শুল্ক নীতি বজায় রাখে, যা কানাডার রপ্তানি শিল্পে বড় ধাক্কা দেয়।
শুল্কের পরিধি শুধুমাত্র ফেন্টানিল নয়; যুক্তরাষ্ট্র স্বয়ংচালিত গাড়ি, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম পণ্যের ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপ করে, যা কানাডার উৎপাদন ও রপ্তানি খাতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। এই পদক্ষেপগুলো কানাডার অর্থনীতিকে চাপের মধ্যে ফেলতে থাকে এবং দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে অস্থির করে।
আগস্ট মাসে ট্রাম্প ও কানাডার প্রধানমন্ত্রী জোশুয়া ক্যারনি (মার্ক কার্নি) কিছু শুল্কের পুনর্বিবেচনা নিয়ে চুক্তিতে পৌঁছান। উভয় পক্ষ কিছু সীমিত ব্যবস্থা প্রত্যাহার করে, তবে সম্পূর্ণ ও সমন্বিত চুক্তি এখনও অর্জিত হয়নি। এই আংশিক সমঝোতা বাণিজ্যিক উত্তেজনা কিছুটা কমিয়ে দেয়, তবে দীর্ঘমেয়াদী সমাধান এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
ট্রাম্পের সময়কালে তিনি বারবার কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম রাজ্য করার প্রস্তাব দেন, যা কানাডার সরকারী দৃষ্টিকোণ থেকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী এই মন্তব্যকে জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি আঘাত হিসেবে বিবেচনা করে, এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি রক্ষা করতে দৃঢ় অবস্থান নেন।
এইসব উত্তেজনা পুনরায় উন্মোচিত হতে পারে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র‑মেক্সিকো‑কানাডা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (USMCA) পুনরায় আলোচনার প্রস্তুতি চলছে। কানাডা সরকার জানিয়েছে যে তারা জানুয়ারি মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে নতুন আলোচনার সূচনা করবে। এই আলোচনায় শুল্ক, বাজার প্রবেশাধিকার এবং উৎপাদন মানদণ্ডের পুনঃনির্ধারণের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
বর্তমান USMCA চুক্তিতে বেশ কিছু পণ্য ও সেবা শুল্কমুক্ত হিসেবে তালিকাভুক্ত, যা ট্রাম্পের শুল্ক নীতির অধীনে শুল্ক আরোপের ঝুঁকি থেকে রক্ষা পায়। তবে নতুন আলোচনার ফলে এই ব্যতিক্রমগুলো পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে, যা কানাডার রপ্তানি খাতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ বা সুযোগ উভয়ই তৈরি করতে পারে।
কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য শীর্ষ রপ্তানি গন্তব্য, যেখানে ৩৬টি শিল্পের পণ্য প্রধানত যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিকৃত হয়। তাই দূত ওয়াইজম্যানের ভূমিকা কেবল কূটনৈতিক নয়, বরং বাণিজ্যিক দিক থেকে দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। তার নেতৃত্বে কানাডা-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্কের স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে, যা উভয় দেশের ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের জন্য দীর্ঘমেয়াদী লাভজনকতা বয়ে আনবে।
সংক্ষেপে, মার্ক ওয়াইজম্যানের দূত নিযুক্তি কানাডার জন্য একটি কৌশলগত পদক্ষেপ, যা শুল্ক ও বাণিজ্য নীতির পরিবর্তনশীল পরিবেশে দেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয়। আসন্ন USMCA পুনঃআলোচনা এবং ট্রাম্পের পূর্ববর্তী শুল্ক নীতির প্রভাব বিবেচনা করে, ওয়াইজম্যানের কাজের পরিধি বিস্তৃত এবং চ্যালেঞ্জপূর্ণ হবে। তার কূটনৈতিক দক্ষতা ও আর্থিক পটভূমি কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বিত ও সমৃদ্ধ সম্পর্ক গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।



