রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে প্রায় ৬০০ মাইল দীর্ঘ ফ্রন্টলাইনে রাশিয়ান সেনাবাহিনীর সামরিক কৌশল পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি ও আক্রমণ প্রধান হয়ে উঠেছে, আর ঐতিহ্যবাহী ঘোড়া ও মোটরসাইকেল ইউনিট নতুন ভূমিকা গ্রহণ করেছে। এই যুদ্ধ ফেব্রুয়ারি ২০২২-এ শুরু হওয়ার পর থেকে এখনও চলমান, এবং সামরিক প্রযুক্তির পুরোনো ও নতুন উপাদানের মিশ্রণ স্পষ্টতই বাড়ছে।
ফ্রন্টলাইনের অধিকাংশ পর্যবেক্ষণ ও আক্রমণ এখন ড্রোনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। রাশিয়ান বাহিনী ড্রোন ব্যবহার করে শত্রু অবস্থান সনাক্ত করে, রিয়েল-টাইম তথ্য সংগ্রহ করে এবং লক্ষ্যবস্তুতে বোমা ফেলতে সক্ষম। এই পদ্ধতি দীর্ঘ দূরত্বে দ্রুত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করে, ফলে ঐতিহ্যবাহী সরাসরি গুলির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
রাশিয়ান সেনা যখন অগ্রসর হয়, তখন তারা বিস্ফোরকবাহী ড্রোন ব্যবহার করে শত্রু প্রতিরক্ষা ভেঙে ফেলার চেষ্টা করে। ড্রোন থেকে নিক্ষিপ্ত বোমা দ্রুত লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছে, ফলে স্থলবাহিনীর সরাসরি গুলিবর্ষণ এখন বিরল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কৌশলটি যুদ্ধের গতিপথকে দ্রুত পরিবর্তন করে, বিশেষত শত্রু লাইন ভাঙতে ড্রোনের ভূমিকা বাড়িয়ে দেয়।
ঘোড়ার ব্যবহার যুদ্ধের ইতিহাসে নতুন নয়; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও ঘোড়া গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন ও যোদ্ধা সরঞ্জাম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। ইউক্রেনের বর্তমান সংঘাতে রাশিয়ান বাহিনী আবার ঘোড়া ব্যবহার করছে, বিশেষত কঠিন ভূখণ্ডে যেখানে মেকানিক্যাল যানবাহন চলাচল করতে পারে না। এই পুরোনো পদ্ধতি আধুনিক ড্রোনের সঙ্গে মিলে একটি অপ্রত্যাশিত সমন্বয় তৈরি করেছে।
ড্রোনের হুমকি মোকাবেলায় রাশিয়ান ইউনিটগুলো এখন মোটরসাইকেল ভিত্তিক কম প্রযুক্তির কৌশলও গ্রহণ করেছে। দ্রুতগতির মোটরসাইকেল দলগুলো ড্রোনের নজরদারির বাইরে গিয়ে শত্রু অবস্থানে প্রবেশ করে, ফলে ড্রোনের পর্যবেক্ষণ সীমা কমে যায়। এই পদ্ধতি ড্রোনের উচ্চ প্রযুক্তি বৈশিষ্ট্যকে সরল, গতিশীল সরঞ্জামের সঙ্গে যুক্ত করে নতুন যুদ্ধের মডেল গড়ে তুলছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই পরিবর্তনকে উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। ন্যাটোর প্রধান প্রতিনিধিরা রাশিয়ার ড্রোন-ভিত্তিক আক্রমণকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে, এবং ইউক্রেনকে অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা সহায়তা প্রদান করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচ্চপদস্থ কূটনীতিকও রাশিয়ার পুরোনো ও নতুন প্রযুক্তির মিশ্রণকে যুদ্ধের দীর্ঘায়ু বাড়ানোর সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন।
বিশ্লেষকরা বলেন, ড্রোন ও ঘোড়ার সমন্বয় রাশিয়ার কৌশলগত নমনীয়তা বাড়াচ্ছে, তবে একই সঙ্গে লজিস্টিক চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে। ঘোড়া ও মোটরসাইকেল ইউনিটগুলোকে ড্রোনের তথ্যের সঙ্গে সমন্বয় করতে উচ্চমানের যোগাযোগ ব্যবস্থা দরকার, যা সরবরাহ শৃঙ্খলে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। এই দ্বৈত পদ্ধতি ভবিষ্যতে অন্যান্য সংঘাতে কীভাবে গ্রহণযোগ্য হবে, তা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।
পরবর্তী কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনা এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের রেজোলিউশন প্রত্যাশিত। বিশেষজ্ঞরা ইঙ্গিত করছেন, যদি রাশিয়ান বাহিনী ড্রোনের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে চালনা চালিয়ে যায়, তবে ভবিষ্যতে আরও উচ্চতর প্রযুক্তির অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা বাড়বে। অন্যদিকে, ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা শক্তি ড্রোনের বিরুদ্ধে ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ও প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা উন্নত করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।
সারসংক্ষেপে, ইউক্রেনের যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে ড্রোন, ঘোড়া ও মোটরসাইকেল ইউনিটের সমন্বয় রাশিয়ান কৌশলের একটি নতুন রূপ প্রকাশ করছে। পুরোনো ও আধুনিক প্রযুক্তির এই অদ্ভুত মেলবন্ধন যুদ্ধের গতিপথকে পুনর্গঠন করছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কূটনৈতিক ও সামরিকভাবে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করছে। ভবিষ্যতে এই মিশ্রণ কীভাবে বিকশিত হবে, তা নির্ভর করবে উভয় পক্ষের কূটনৈতিক পদক্ষেপ এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের উপর।



