ব্রিটিশ গায়ক ও গীতিকার ক্রিস রিয়া, যিনি ‘ড্রাইভিং হোম ফর ক্রিসমাস’ গানের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি অর্জন করেন, সোমবার হাসপাতালে স্বল্প সময়ের অসুস্থতার পর ৭৪ বছর বয়সে নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার পরিবার একটি বিবৃতি প্রকাশ করে জানায় যে রিয়া শান্তভাবে পরিবারিক সান্নিধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন। এই সংবাদটি সঙ্গীত জগতের পাশাপাশি ভক্তদের মধ্যে গভীর শোকের স্রোত তৈরি করেছে।
পরিবারের পক্ষ থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে রিয়ার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে গভীর শোকের সঙ্গে স্মরণ করা হয়েছে এবং তার অকাল প্রয়াণে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। পরিবার জানায় রিয়া তার শেষ দিনগুলোতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ছিলেন এবং তার প্রিয়জনদের সান্নিধ্যে শেষ নিঃশ্বাস তোলেন। এই মুহূর্তে সঙ্গীতপ্রেমীরা তার সৃষ্টিগুলোর স্মৃতি পুনরায় জাগিয়ে তুলছে।
রিয়ার ক্যারিয়ার ১৯৭০-এর দশক থেকে শুরু হয়ে বহু হিট গানের মাধ্যমে সঙ্গীতপ্রেমীদের হৃদয় জয় করেছে। ‘অবর্জ’, ‘অন দ্য বিচ’, ‘ফুল (ইফ ইউ থিঙ্ক ইটস ওভার)’, ‘লেটস ড্যান্স’ এবং ‘রোড টু হেল’ সহ বহু গীত তার রেকর্ডে রয়েছে। তার সুরে ব্লুজের ছোঁয়া এবং মেলোডিক গঠন তাকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে আলাদা পরিচয় দিয়েছে। এই গানের মাধ্যমে তিনি বহু পুরস্কার ও স্বীকৃতি অর্জন করেন।
মিডলসব্রো FC, রিয়ার জন্মস্থান টিসসাইডের ক্লাব, সামাজিক মাধ্যম X-এ তার মৃত্যুর সংবাদে গভীর শোক প্রকাশ করে। ক্লাবের পক্ষ থেকে প্রকাশিত বার্তায় রিয়াকে টিসসাইডের আইকন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং তার শান্তিপূর্ণ বিশ্রামের কামনা করা হয়েছে। এই প্রকাশনা রিয়ার স্থানীয় সমর্থকদের মধ্যে বিশেষভাবে সাড়া ফেলেছে।
‘ড্রাইভিং হোম ফর ক্রিসমাস’ গানের মূল থিম হল দীর্ঘ যাত্রাপথে ট্রাফিক জ্যামে আটকে থাকা এক ভ্রমণকারীর বাড়ি ফেরার আকাঙ্ক্ষা। গীতটি ১৯৮০-এর দশকে প্রকাশের পর থেকে ক্রিসমাসের সময়ে রেডিও ও টেলিভিশনে ঘন ঘন শোনা যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই গানের সুর M&S ফুডের ক্রিসমাস বিজ্ঞাপনে ব্যবহার হয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছেছে।
২০২০ সালে রিয়ার সামাজিক মাধ্যমের পোস্টে তিনি ও তার বন্ধু বব মর্টিমার, উভয়ই মিডলসব্রো নেটিভ, গানের সৃষ্টিকাহিনী শেয়ার করেন। পোস্টে রিয়া উল্লেখ করেন যে গানটি রচনার সময় তিনি বেকারত্বে ছিলেন এবং তার ম্যানেজারও তাকে ছেড়ে গিয়েছিলেন। তাছাড়া তিনি গাড়ি চালানোর অনুমতি থেকে বঞ্চিত ছিলেন, যা গানের শিরোনামের মূল ধারণা গড়ে তুলেছিল।
গানের অনুপ্রেরণা হিসেবে রিয়া বর্ণনা করেন যে তার তখনকার বান্ধবী জোয়ান, যাকে তিনি ১৬ বছর বয়সে জানতেন এবং পরে স্ত্রী হন, লন্ডনে তার ছোট মিনি গাড়িতে তাকে তুলে বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন। এই অভিজ্ঞতা তাকে দীর্ঘ যাত্রাপথে বাড়ি ফেরার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে গান রচনার প্রেরণা দেয়। রিয়া ১৯৭৮ সালে গীতটি রচনা করেন, তবে এটি ১৯৮৮ সালে একক সিঙ্গেল হিসেবে প্রকাশ পায়।
গানটি প্রকাশের পর রিয়া একবার মজার মন্তব্য করেন যে এই গানের মাধ্যমে তিনি মালদ্বীপে একটি ছোট ছুটি উপভোগ করতে পেরেছেন। এই রসিকতা গানের জনপ্রিয়তা ও তার ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে যুক্ত একটি হালকা মুহূর্ত হিসেবে স্মরণীয়।
‘ড্রাইভিং হোম ফর ক্রিসমাস’ গানের সুর ও কথার প্রতি সম্মান জানিয়ে এঙ্গেলবার্ট হাম্পারডিঙ্ক এবং স্টেসি সোলোমনসহ বিভিন্ন শিল্পী গানের কভার সংস্করণ প্রকাশ করেছেন। এই কভারগুলো গানের বহুমুখিতা ও সময়ের সঙ্গে তার প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরে।
রিয়া ও বব মর্টিমার ১৯৯৭ সালে মিডলসব্রো ফুটবল ক্লাবের এফএ কাপ ফাইনালের জন্য ‘লেটস ড্যান্স’ গানে একসাথে কাজ করেন। এই সহযোগিতা ক্লাবের ভক্তদের মধ্যে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয় এবং রিয়ার স্থানীয় সংযোগকে আরও দৃঢ় করে।
সঙ্গীত ক্যারিয়ারের উত্থান-পতনের পাশাপাশি রিয়া দীর্ঘ সময় ধরে স্বাস্থ্যের সমস্যার সঙ্গে লড়াই করেছেন। কয়েক বছর আগে তার অগ্ন্যাশয় অপসারণ করা হয়েছিল, যা তার শারীরিক অবস্থায় প্রভাব ফেলেছিল। তবে তিনি সঙ্গীত সৃষ্টিতে অবিচল থেকেছেন এবং তার ভক্তদের জন্য নতুন সুর তৈরি করে গেছেন।
ক্রিস রিয়ার অকাল প্রয়াণ সঙ্গীত জগতের জন্য একটি বড় ক্ষতি, তবে তার সৃষ্টিগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। তার গানের সুর ও কথায় যে মানবিক অনুভূতি ও স্মৃতি জড়িয়ে আছে, তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও মধুর হয়ে উঠবে। ভক্তদের জন্য এখনো তার সঙ্গীত শোনার, স্মরণ করার এবং তার সৃষ্টিগুলোকে সম্মান জানানোর সময়।



