ঢাকার ধানমন্ডি অফিসে কেন্দ্র ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) কর্তৃক আয়োজিত গবেষণা ফলাফল প্রকাশের অনুষ্ঠানে ইলেকট্রিক তিনচাকার গাড়ি (ই-থ্রি-হুইলার) নিয়ে বিশেষজ্ঞ ও সরকারি কর্মকর্তারা একমত হয়েছেন যে, এই গাড়িগুলোকে জনপরিবহনের অংশ হিসেবে নিয়মিত নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনতে হবে।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এবং প্রোগ্রাম সহযোগী খালিদ মাহমুদের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ই-থ্রি-হুইলারের সংখ্যা ৪০ থেকে ৬০ লক্ষের মধ্যে রয়েছে বলে প্রকাশ পেয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই গাড়িগুলোর প্রায় নব্বই শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত, যা স্থানীয় শিল্পের জন্য একটি বড় আয় সৃষ্টি করছে।
ঢাকা শহরে রিকশার মোডাল শেয়ার ২০০৯ সালে ৩৮.৭ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে ৩০.১ শতাংশে নেমে এসেছে, তবে এখনও শহরের মোট পরিবহন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, ই-থ্রি-হুইলারের দ্রুত এবং অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি পরিবহন ব্যবস্থার নিরাপত্তা, পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর নানা ঝুঁকি তৈরি করেছে।
এ পর্যন্ত বাংলাদেশে ই-থ্রি-হুইলারের জন্য কোনো সমগ্র নীতি বা বিধান গৃহীত হয়নি, ফলে বাজারে প্রবেশের মানদণ্ড ও নিরাপত্তা মানদণ্ডের অভাব দেখা দেয়।
বেশিরভাগ গাড়ি লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি ব্যবহার করে, যার অনিয়মিত রিসাইক্লিং প্রক্রিয়ায় পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব পড়ে।
গবেষণার অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ে গাড়িগুলোর বিস্তার নিয়ন্ত্রণে না থাকায় একসাথে বন্ধ করা সম্ভব নয়; তারা ইতিমধ্যে শহরের পরিবহন নেটওয়ার্কের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
এজন্য, বিশেষজ্ঞরা প্রস্তাব করেন যে, ই-থ্রি-হুইলারের ব্যবহার ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা এবং একই সঙ্গে কঠোর নিয়মাবলী প্রয়োগের মাধ্যমে সিস্টেমকে টেকসই করা উচিত।
তবে, ভবিষ্যতে নতুন গাড়ির অতিরিক্ত প্রবেশ রোধ করা জরুরি, যাতে অতিরিক্ত ভিড় ও পরিবেশগত ক্ষতি এড়ানো যায়।
সিপিডি এই গবেষণা পরিচালনা করে এবং ই-থ্রি-হুইলারের টেকসইতা, নিয়ন্ত্রণ ও শহুরে পরিবহন ব্যবস্থায় সংহতকরণ নিয়ে আলোচনা করার জন্য একটি কর্মশালা আয়োজন করেছে।
এই কর্মশালায় বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেছেন যে, গাড়িগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যাটারির নিরাপদ নিষ্পত্তি এবং চালকদের প্রশিক্ষণসহ বহু দিক থেকে সমন্বিত নীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ই-থ্রি-হুইলার শিল্পে সরাসরি প্রায় ষাট লক্ষ মানুষ কর্মসংস্থান পায়, যা দেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতিতে একটি বড় অবদান রাখে।
এই বৃহৎ কর্মশক্তি বিবেচনা করে, একসাথে গাড়ি বন্ধ করার পরিবর্তে ধাপে ধাপে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা অধিক বাস্তবসম্মত বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেন।
নিয়ন্ত্রণের আওতায় গাড়িগুলোর গতি, যাত্রী সংখ্যা, নিরাপত্তা সরঞ্জাম এবং ব্যাটারির মানদণ্ড নির্ধারিত হলে, সড়ক নিরাপত্তা ও পরিবেশ সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য উন্নতি আশা করা যায়।
এছাড়া, স্থানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য মানসম্পন্ন ব্যাটারি ও প্রযুক্তি উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে, যা শিল্পের গুণগত মান বাড়াবে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, সরকার যদি দ্রুত নীতি প্রণয়ন করে এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে, তবে ই-থ্রি-হুইলারকে শহুরে পরিবহনের একটি নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব বিকল্পে রূপান্তর করা সম্ভব।
অন্যদিকে, অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট সমস্যাগুলো সমাধান না হলে ট্র্যাফিক জ্যাম, দুর্ঘটনা এবং পরিবেশ দূষণ বাড়তে পারে।
সিপিডি এই গবেষণার মাধ্যমে ই-থ্রি-হুইলারকে টেকসই শহুরে পরিবহন নেটওয়ার্কে সংযুক্ত করার পথনির্দেশনা প্রদান করেছে এবং সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের জন্য প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেছে।
সারসংক্ষেপে, ই-থ্রি-হুইলার শিল্পের বিস্তারকে নিয়ন্ত্রণে আনতে কঠোর নীতি, নিরাপদ ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা এবং ধাপে ধাপে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন, যাতে এই গাড়িগুলো শহরের পরিবহন ব্যবস্থার জন্য উপকারী এবং টেকসই হয়ে ওঠে।



