ইরানের সামরিক মহড়া নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সন্দেহের বাতাস বইছে; যুক্তরাষ্ট্র‑ইসরায়েল উভয়ই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেছে, আর ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে যে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করা হয়নি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় মিডিয়া একই দিনে প্রকাশ করে যে, সাম্প্রতিক কোনো ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা পরিচালিত হয়নি এবং প্রকাশিত তথ্যগুলোকে ‘অবগত সূত্র’ হিসেবে উল্লেখ করে, ফলে সরকারী দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো সক্রিয় পরীক্ষা না হওয়ার কথা নিশ্চিত করা হয়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এনবিসি নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মকর্তারা ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুনরায় শক্তিশালী করার সম্ভাবনা দেখছে। তারা ইরানের পারমাণবিক জ্বালানি সমৃদ্ধিকরণ কেন্দ্রগুলোও পুনরায় সক্রিয় হতে পারে বলে সতর্কতা দিচ্ছেন।
বিশেষত ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জানাতে পারেন, যা দুই দেশের কূটনৈতিক সমন্বয়ের ইঙ্গিত দেয়। এই সম্ভাব্য যোগাযোগের মাধ্যমে ইরানের সামরিক পরিকল্পনা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।
পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারকে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। তারা আশঙ্কা করে যে, ভবিষ্যতে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করলে, এই ব্যালিস্টিক রকেটগুলোকে ডেলিভারির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে।
ইরান সরকার বারবার জোর দিয়ে বলছে যে, তাদের পারমাণবিক বোমা তৈরির কোনো পরিকল্পনা নেই এবং পারমাণবিক অস্ত্রের দিকে অগ্রসর হওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই। তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও নীতিমালা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নৌ শাখা এই মাসের শুরুর দিকে দুই দিনের সামরিক মহড়া চালিয়েছে। এই মহড়া নৌবাহিনীর কৌশলগত প্রস্তুতি এবং সমুদ্র নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রশিক্ষণকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়।
এই ঘটনাগুলোকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা ২০১৫ সালে পারমাণবিক চুক্তি (JCPOA) ভেঙে যাওয়ার পর থেকে ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক নীতি পুনরায় মূল্যায়নের একটি পর্যায় হিসেবে দেখছেন। তারা উল্লেখ করেন যে, ইরানের সামরিক প্রশিক্ষণ এবং পারমাণবিক অবকাঠামোর সম্ভাব্য পুনরায় সক্রিয়তা পূর্বের চুক্তি ভঙ্গের পরের ধারাবাহিকতা হতে পারে।
একজন কূটনীতিকের মতে, যুক্তরাষ্ট্র‑ইসরায়েল এই ধরনের সম্ভাব্য ঝুঁকির মুখে দ্রুত কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে পারে, যার মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমের ওপর আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ বাড়ানো এবং সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি অন্তর্ভুক্ত। তিনি আরও বলেন, ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র নীতি সম্পর্কে স্পষ্টতা না পাওয়া পর্যন্ত নিরাপত্তা সংক্রান্ত নীতি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকে, ইরানের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কার্যক্রমের পুনরুজ্জীবন মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোকে অস্থিতিশীল করতে পারে। বিশেষ করে ইরাক, সউদি আরবিয়া এবং গাজা অঞ্চলে ইতিমধ্যে চলমান সংঘাতের সঙ্গে এই সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ যুক্ত হলে উত্তেজনা বাড়তে পারে।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র‑ইসরায়েল কূটনৈতিক সংলাপ বাড়াতে পারে, যার মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমের পর্যবেক্ষণ বাড়ানোর জন্য আন্তর্জাতিক পারমাণবিক এজেন্সি (IAEA) এর সঙ্গে সমন্বয় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এছাড়া, ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র নীতি সম্পর্কে স্পষ্টতা না পাওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা পরামর্শদাতা সংস্থা ও ইসরায়েলি নিরাপত্তা সংস্থা একত্রে কৌশলগত পরিকল্পনা তৈরি করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ইরানের সাম্প্রতিক নৌ মহড়া এবং সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুনরায় সক্রিয় করার সন্দেহের মধ্যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয়ই সতর্কতা প্রকাশ করেছে, আর ইরানের সরকারী সূত্রে কোনো পরীক্ষা না হওয়ার দাবি করা হয়েছে। এই দ্বিমুখী অবস্থান আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিবেশে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে এবং পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপের জন্য ভিত্তি স্থাপন করেছে।



