পাকিস্তান সরকার লিবিয়ার ন্যাশনাল আর্মি (LNA)‑কে ৪ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির চুক্তি সম্পন্ন করেছে, যদিও জাতিসংঘের লিবিয়ার ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এই চুক্তি লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলের বেনগাজিতে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে, পাকিস্তানের সামরিক প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ও LNA‑এর ডেপুটি কমান্ডার‑ইন‑চিফ সাদ্দাম খলিফা হাফতারের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়।
চুক্তির বিবরণে ১৬টি JF‑17 মাল্টি‑রোল ফাইটার জেট এবং ১২টি সুপার মুশাক প্রশিক্ষণ বিমান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা পাইলট প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হয়। এছাড়া ভূমি, সমুদ্র ও আকাশে ব্যবহারযোগ্য বিভিন্ন সরঞ্জামও ২.৫ বছরের মধ্যে সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। চুক্তির মোট মূল্য দুইটি সূত্র অনুযায়ী ৪ বিলিয়ন ডলার থেকে ৪.৬ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
চুক্তি সম্পন্নের পর লিবিয়ার সরকারি মিডিয়া চ্যানেল জানিয়েছে যে LNA ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার মধ্যে অস্ত্র বিক্রয়, যৌথ প্রশিক্ষণ এবং সামরিক উৎপাদন অন্তর্ভুক্ত। তবে চুক্তির নির্দিষ্ট শর্তাবলী ও পরিমাণ সম্পর্কে কোনো বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সামরিক বাহিনী চুক্তি সম্পর্কে মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছে। চুক্তিতে জড়িত চারজন পাকিস্তানি কর্মকর্তা, যারা প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে কাজ করেন, গোপনীয়তার কারণে নাম প্রকাশ করতে অস্বীকার করেছেন।
লিবিয়া ২০১১ সালে ন্যাটো‑সমর্থিত বিদ্রোহের পর গৃহযুদ্ধের মধ্যে আটকে গিয়েছিল, যার ফলে দেশটি দুইটি প্রতিদ্বন্দ্বী শাসন কাঠামোর মধ্যে বিভক্ত হয়েছে। জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা মূলত এই অস্থিতিশীলতা রোধের জন্য আরোপিত হয়েছিল, তবে LNA‑এর সঙ্গে এই চুক্তি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছ থেকে সমালোচনা উস্কে তুলতে পারে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, পাকিস্তানের এই বৃহৎ অস্ত্র বিক্রয় তার চীনের সঙ্গে যৌথভাবে উন্নত JF‑17 জেটের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াবে এবং মধ্যপ্রাচ্য‑উত্তর আফ্রিকায় তার কূটনৈতিক প্রভাব বিস্তারের একটি কৌশল হতে পারে। একই সঙ্গে, লিবিয়ার শাসন কাঠামোর মধ্যে সামরিক ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন করে, ইউরোপীয় ও আমেরিকান নীতি গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে।
অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও LNA‑এর সঙ্গে এই ধরনের চুক্তি স্বাক্ষর করা আন্তর্জাতিক আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন পূর্বে লিবিয়ার বিভিন্ন গোষ্ঠীর ওপর অস্ত্র সরবরাহে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে, এবং এই চুক্তি তাদের নীতি সমর্থনকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
পাকিস্তানের সামরিক শিল্পের জন্য JF‑17 এবং সুপার মুশাকের রপ্তানি একটি উল্লেখযোগ্য আয় স্রোত হতে পারে, বিশেষ করে যখন দেশটি দীর্ঘমেয়াদী রপ্তানি চুক্তি অনুসন্ধান করছে। চুক্তির সময়সীমা ২.৫ বছর হওয়ায় সরবরাহের ধাপভিত্তিক পরিকল্পনা করা হবে, যা উভয় পক্ষের লজিস্টিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা সহজ করবে।
লিবিয়ার অভ্যন্তরীণ সংঘাতের ফলে দেশের অবকাঠামো ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এবং সামরিক সরঞ্জামের ক্রয় দেশীয় পুনর্গঠনকে ত্বরান্বিত করতে পারে। তবে একই সঙ্গে, অস্ত্রের প্রবাহ বাড়লে সংঘাতের তীব্রতা বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের শান্তি রক্ষার প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলতে পারে।
এই চুক্তি সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবাধিকার সংস্থাগুলি এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি, তবে তারা লিবিয়ার মানবিক সংকটের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে সতর্কতা প্রকাশ করেছে।
সামগ্রিকভাবে, পাকিস্তানের লিবিয়ার সঙ্গে এই বিশাল অস্ত্র বিক্রির চুক্তি উভয় দেশের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা নীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে, এবং তা ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় শক্তি গঠনের গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে।



