পেন্টাগনের সাম্প্রতিক একটি খসড়া প্রতিবেদনে চীনের তিনটি ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে ইতিমধ্যে শতাধিক আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক মিসাইল (ICBM) স্থাপন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই দাবি অনুসারে, বেইজিংয়ের সামরিক ক্ষমতা দ্রুতগতিতে আধুনিকায়নের পথে অগ্রসর হচ্ছে, যা বিশ্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি চীনের সামরিক আধুনিকীকরণকে অন্যান্য পারমাণবিক শক্তির তুলনায় দ্রুতগতি সম্পন্ন বলে বর্ণনা করে এবং বেইজিংয়ের কৌশলগত লক্ষ্যগুলোকে পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। বিশেষ করে, তিনটি সাইলো ফিল্ডে ICBM মোতায়েনের তথ্যকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য একটি সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, চীনের সামরিক বাজেটের ধারাবাহিক বৃদ্ধি এবং উচ্চ প্রযুক্তির অস্ত্রের ক্রমবর্ধমান সংযোজন তার পারমাণবিক নীতি ও কৌশলকে পুনর্গঠন করতে পারে। তবে, এই বিশ্লেষণকে চীনা কর্তৃপক্ষ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। চীনা সরকার এই ধরনের রিপোর্টকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে চীনকে হেয় করার এবং বিভ্রান্তি সৃষ্টির উদ্দেশ্যপূর্ণ প্রচেষ্টা বলে বিবেচনা করে।
বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে, পেন্টাগনের এই দাবিগুলি কেবলমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূর্ণ এবং বাস্তব তথ্যের চেয়ে কল্পনা ভিত্তিক। চীনের সরকারী বিবৃতি অনুসারে, এমন কোনো রিপোর্টের ভিত্তি নেই এবং এটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংলাপকে বাধাগ্রস্ত করার উদ্দেশ্য বহন করে।
মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ আলোচনা শুরু করার পরিকল্পনা প্রকাশ করেন। তবে, পেন্টাগনের খসড়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, চীনের পক্ষ থেকে এমন কোনো আলোচনার প্রতি কোনো স্পষ্ট আগ্রহ দেখা যায়নি এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে তারা এখনও দ্বিধাগ্রস্ত।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২৪ সাল পর্যন্ত চীনের মোট পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা প্রায় ৬০০টি, এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা এক হাজারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। এই সংখ্যা বৃদ্ধি চীনের সামরিক কৌশলে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নির্দেশ করে, যদিও চীনা সরকার ধারাবাহিকভাবে আত্মরক্ষামূলক পারমাণবিক নীতি অনুসরণ করে এবং প্রথমে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার না করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে।
চীনের পারমাণবিক নীতি সম্পর্কে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলেন, আত্মরক্ষামূলক নীতি সত্ত্বেও, বৃহৎ পরিসরের ICBM মোতায়েন কৌশলগত ভারসাম্যকে প্রভাবিত করতে পারে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তা নীতিতে পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে, তাইওয়ান সংক্রান্ত উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে এই অস্ত্রের ব্যবহারিকতা ও কৌশলগত গুরুত্ব পুনরায় বিবেচনা করা হতে পারে।
পেন্টাগনের রিপোর্টে তাইওয়ান ইস্যু সম্পর্কেও সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করেন, চীনের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তাইওয়ানকে পুনরায় সংযুক্তি করার ইচ্ছা অঞ্চলীয় নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। তাইওয়ান পার্শ্ববর্তী দেশগুলো এই পরিস্থিতিতে তাদের প্রতিরক্ষা নীতি পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এখন চীনের পারমাণবিক নীতি ও অস্ত্র আধুনিকীকরণকে একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছেন, যেখানে কূটনৈতিক সংলাপের সুযোগ এখনও সীমিত। যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া, চীনকে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে যুক্ত করার জন্য বহুবার আহ্বান জানিয়েছে, তবে চীনের স্পষ্ট অস্বীকৃতি এই প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলেছে।
ভবিষ্যতে, পেন্টাগনের অনুমান অনুসারে, ২০২৫ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে চীনের পারমাণবিক ক্ষমতা দ্বিগুণ হতে পারে, যা গ্লোবাল পারমাণবিক ভারসাম্যের পুনঃমূল্যায়নকে বাধ্য করবে। এই প্রেক্ষাপটে, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং প্রধান শক্তিগুলোর জন্য চীনের সঙ্গে সরাসরি সংলাপের মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তীব্রতর হবে।
সারসংক্ষেপে, পেন্টাগনের খসড়া রিপোর্ট চীনের দ্রুতগতির সামরিক আধুনিকীকরণ, বিশেষ করে ICBM মোতায়েনের সম্ভাবনা, এবং এর ফলে উদ্ভূত কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জকে তুলে ধরেছে। চীনের প্রত্যাখ্যান এবং আত্মরক্ষামূলক পারমাণবিক নীতি, পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ উদ্যোগের পারস্পরিক সম্পর্ক, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নীতির গঠনকে প্রভাবিত করবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এখনই গুরুত্বপূর্ণ হল, এই উন্নয়নগুলোকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং কূটনৈতিক চ্যানেলগুলোকে সক্রিয় রাখা।



