এক বছর বয়সী ফিলিস্তিনি মেয়ে সিভার আশুর, যাকে জর্ডানের চিকিৎসা রপ্তানি কর্মসূচির মাধ্যমে গাজা থেকে আম্মান পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, ৩ ডিসেম্বর জর্ডান থেকে ফিরে গাজায় আবার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। তার শৈশবের প্রথম বছর থেকেই তীব্র পুষ্টি ঘাটতি ও রোগের ঝুঁকি ছিল, যা তাকে বিদেশে বিশেষায়িত চিকিৎসা গ্রহণের জন্য প্রেরণ করা হয়েছিল।
সিভার জর্ডানে ছয় মাসের বেশি সময় ধরে আল-আকসা মার্টির্স হাসপাতালের সমতুল্য সুবিধায় চিকিৎসা পেয়েছিল। তার দাদী সাহার আশুরের মতে, গাজায় ফিরে আসার তিন দিন পর শিশুটির স্বাস্থ্যের অবনতি শুরু হয়। শিশুটি হঠাৎ করে বমি ও ডায়রিয়া দেখা দেয় এবং এই উপসর্গগুলো কয়েক দিন ধরে থেমে না।
ডায়রিয়া এবং বমি সিভারের শারীরিক অবস্থাকে দ্রুত খারাপ করে তুলেছে, ফলে তার পুষ্টি শোষণ ক্ষমতাও প্রভাবিত হয়েছে। দাদী জানান, শিশুটি নিয়মিতভাবে তরল ও পুষ্টি গ্রহণে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে, যা তার ইতিমধ্যে দুর্বল ইমিউন সিস্টেমকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিশেষায়িত শিশুর ফর্মুলা ছাড়া তার পুষ্টি চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
গাজার কেন্দ্রীয় অংশে অবস্থিত আল-আকসা মার্টির্স হাসপাতালের ড. খালিল আল-দাকর জানান, সিভারকে গ্যাস্ট্রোইনটেস্টিনাল সংক্রমণ হয়েছে এবং তার ইমিউন সিস্টেমের দুর্বলতা রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করা কঠিন করে তুলছে। তিনি উল্লেখ করেন, শিশুটিকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পুষ্টি সাপ্লাই প্রদান করা হচ্ছে, তবে হাসপাতালের সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনও অনুকূল নয়।
গাজার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা দীর্ঘ সময়ের সংঘর্ষ ও অবরোধের ফলে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। অক্টোবর মাসে ঘোষিত সাময়িক যুদ্ধবিরতির পরেও, বহু হাসপাতাল এখনও ধ্বংসাবশেষের মধ্যে কাজ করছে, এবং মৌলিক চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ ও বিদ্যুৎ জেনারেটরের ঘাটতি রয়েছে। ড. দাকর উল্লেখ করেন, আল-আকসা মার্টির্স হাসপাতালসহ গাজার সব হাসপাতালই রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতার তিন গুণে বেশি রোগী গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছে।
বিশেষ করে শিশুর রোগে বৃদ্ধি পেয়েছে, কারণ ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামোর ফলে পরিষ্কার পানির অভাব ও অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে। গাজায় অব্যাহত বিদ্যুৎ ঘাটতি হাসপাতালের যন্ত্রপাতি চালু রাখতে বাধা সৃষ্টি করে, ফলে রোগীর যত্নে প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা ও পরিষ্কার পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
সিভারের ক্ষেত্রে, তার পুষ্টি শোষণ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় বিশেষ ফর্মুলা ব্যবহার অপরিহার্য। তবে গাজার বাজারে এই ধরনের ফর্মুলা সীমিত পরিমাণে এবং প্রায়ই উচ্চ মূল্যে পাওয়া যায়, যা দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য অতিরিক্ত বোঝা সৃষ্টি করে। ড. দাকর জোর দিয়ে বলেন, সঠিক পুষ্টি সরবরাহ ছাড়া রোগীর পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ধীর হবে এবং পুনরায় সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়বে।
গাজায় স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলো আন্তর্জাতিক সহায়তার উপর নির্ভরশীল। বর্তমানে, মানবিক সাহায্য সংস্থাগুলো থেকে ওষুধ, পুষ্টিকর সাপ্লাই এবং জেনারেটরের জন্য অনুরোধ বাড়ছে। যদিও সাময়িক যুদ্ধবিরতি কিছুটা শ্বাস নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে, তবে রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরবরাহের ঘাটতি তীব্রতর হয়েছে।
গাজার শিশু হাসপাতালগুলোতে ভর্তি রোগীর সংখ্যা পূর্বের তুলনায় তিন গুণে বেড়েছে, যা বিদ্যমান ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি। ড. দাকর উল্লেখ করেন, এই অতিরিক্ত রোগী চাপের ফলে স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজের চাপও বাড়ছে, এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
গাজার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেন, গাজায় শিশুরা যেসব পুষ্টি ঘাটতি ও সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে, তা কমাতে ত্বরিত মানবিক সহায়তা ও অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ প্রয়োজন।
সিভারের পুনরায় ভর্তি গাজার স্বাস্থ্য সংকটের একটি উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে। তার মতোই বহু শিশু একই ধরনের পুষ্টি সমস্যার সঙ্গে সংগ্রাম করছে, এবং তাদের জন্য বিশেষ ফর্মুলা ও চিকিৎসা সেবা অপরিহার্য।
এই পরিস্থিতিতে, গাজার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সাহায্যের ত্বরিত সরবরাহই একমাত্র সমাধান হতে পারে। পাঠকরা যদি গাজার শিশুদের জন্য সহায়তা করতে চান, তবে মানবিক সংস্থা ও দাতা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দান করা বা সচেতনতা বৃদ্ধি করা একটি কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে। গাজার শিশুরা নিরাপদ ও সুস্থ ভবিষ্যৎ পেতে আমাদের সমষ্টিগত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।



