ইরানের টেহরানের ইভিন কারাগারে প্রায় এক বছর ধরে বন্দি থাকা ৫৩ বছর বয়সী ব্রিটিশ নাগরিক লিন্ডসে ফোরম্যান, ক্রিসমাসের সময় একটি কবিতা রচনা করে পরিবার থেকে দূরে থাকার কষ্ট প্রকাশ করেছেন। তিনি এই কবিতা “ইভিন কারাগার থেকে একটি দুঃখজনক কণ্ঠ – একটি ক্রিসমাস কবিতা” শিরোনামে লিখে, ফোনে তার সন্তান জো বেনেটের সঙ্গে শেয়ার করেছেন। এই রেকর্ডিংটি প্রথমবারের মতো জনসাধারণের কাছে তার কণ্ঠ শোনানো হয়েছে।
কবিতায় তিনি পরিবারকে “ছিন্নভিন্ন” বলে বর্ণনা করে, শোকের গহ্বরকে হৃদয়ের একটি ফাঁকা হিসেবে তুলনা করেছেন। ফোরম্যান উল্লেখ করেন, এই কবিতা তিনি পরিবার এবং যেসব মানুষ ক্রিসমাসে আনন্দের পরিবর্তে দুঃখের মুখোমুখি হন, তাদের জন্য লিখেছেন।
ফোরম্যান এবং তার স্বামী ক্রেগ ফোরম্যান স্পেন থেকে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত মোটরসাইকেল দিয়ে ভ্রমণের পরিকল্পনা করছিলেন, যখন জানুয়ারি মাসে ইরানি কর্তৃপক্ষ তাদের গ্রেপ্তার করে গোপনীয়তা চুরি (espionage) অভিযোগে আটক করে। পরিবার এই অভিযোগকে “অযৌক্তিক” বলে খণ্ডনা করে। দম্পতির কাছে বৈধ ভিসা, ট্যুর গাইড এবং পূর্ব অনুমোদিত ভ্রমণসূচি ছিল। ফোরম্যান ভ্রমণের সময় বিভিন্ন দেশের মানুষকে “সুন্দর জীবন কী” নিয়ে প্রশ্ন করতেন; এই প্রশ্নগুলোই ইরানি কর্তৃপক্ষের অভিযোগের ভিত্তি বলে দাবি করা হচ্ছে।
দম্পতি বর্তমানে ইভিন কারাগারে আলাদা আলাদা সেলে আটক। এই কারাগারটি পূর্বে নাজানিন জাগরি-রাটক্লিফের মতো উচ্চপ্রোফাইল বন্দিদেরও ধারণ করেছে। পরিবার জানায়, সেলগুলো অতিরিক্ত ভিড়, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং পোকামাকড়ে পূর্ণ। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সামগ্রী এবং স্নান সুবিধা অপর্যাপ্ত। জো বেনেট, ফোরম্যানের পুত্র, বর্ণনা করেন, রাঁধুনিতে ইঁদুরের গর্জন শোনা যায় এবং খাবার কম, ফলে তাদের ওজন হ্রাস পাচ্ছে। স্বামী ক্রেগের দাঁতে ক্রমাগত ব্যথা রয়েছে, তবে কোনো দন্তচিকিৎসকের সেবা পাওয়া যাচ্ছে না।
গত মাসে দম্পতি ক্ষুধা ধর্মে অংশগ্রহণের পর, ইরানি কর্তৃপক্ষ তাদেরকে প্রায় প্রতিদিন পরিবারের সঙ্গে ফোনের মাধ্যমে কথা বলার সুযোগ দিয়েছে। তবে জো বেনেটের মতে, এই যোগাযোগের সুযোগ সত্ত্বেও তাদের মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণে এখনও বড় বাধা রয়ে গেছে।
ইরানে বিদেশি নাগরিকের আটক নিয়ে যুক্তরাজ্য সরকার বহুবার নিকটস্থ কূটনৈতিক চ্যানেল দিয়ে ইরানকে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইরানকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বন্দীদের অবস্থার উন্নতি করতে এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে বলছে। একই সঙ্গে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার সংস্থা ইরানের কারাবাস নীতি নিয়ে সমালোচনা প্রকাশ করেছে এবং ইরানকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে দায়িত্বশীল করতে চায়।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, ইভিন কারাগারের কঠোর শর্তাবলী এবং বিদেশি নাগরিকের ওপর গোপনীয়তা চুরি অভিযোগের ব্যবহার ইরানের কূটনৈতিক চাপে প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা যেতে পারে। তারা বলেন, এই ধরনের মামলা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয় এবং কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়। বিশেষত, যুক্তরাজ্য ও ইরানের মধ্যে চলমান বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা আলোচনার প্রেক্ষাপটে এই ধরনের মানবিক বিষয়গুলোকে উপেক্ষা করা কঠিন।
ফোরম্যানের কবিতা এবং তার রেকর্ডেড বার্তা আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপক দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। মানবাধিকার সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সদস্যরা এখন ইরানকে এই ধরনের কারাবাসের শর্তাবলী পর্যালোচনা করতে এবং বন্দিদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে চাপ দিচ্ছেন। ভবিষ্যতে, যুক্তরাজ্য ও ইরানের কূটনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে ফোরম্যান দম্পতির মুক্তি ও তাদের পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলন সম্ভব হতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নীতি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের মধ্যে একটি জটিল দ্বন্দ্বের উদাহরণ হিসেবে রয়ে গেছে।
ইরানের ইভিন কারাগারে বন্দিত্বের এই ঘটনা, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার নজরে এসে, কূটনৈতিক চাপ বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং ভবিষ্যতে ইরানের বিদেশি নাগরিকের ওপর আরোপিত সীমাবদ্ধতা পুনর্বিবেচনার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। ফোরম্যানের কবিতা, যদিও ব্যক্তিগত বেদনা প্রকাশ করে, তবু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবিক অধিকার রক্ষার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সঙ্কেত হয়ে দাঁড়িয়েছে।



