চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা এলাকায় একটি ক্লাবে সোমবার বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি) তার ৪৮তম বার্ষিক সাধারণ সভা আয়োজন করে। সভায় নৌপরিবহন উপদেষ্টা, অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম. সাখাওয়াত হোসেন মাফিয়া গোষ্ঠীর উপস্থিতি ও তার প্রভাব সম্পর্কে বিশদ মন্তব্য করেন। তিনি উল্লেখ করেন, চট্টগ্রাম বন্দরের আশপাশে দীর্ঘদিন ধরে গঠিত মাফিয়া নেটওয়ার্কের কারণে শিপিং কর্পোরেশন অতীতের বেশ কিছু আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিল।
হোসেনের মতে, মাফিয়া গোষ্ঠীর প্রভাবের ফলে শিপিং কর্পোরেশন লাভজনকভাবে কাজ করতে পারেনি, তবে সাম্প্রতিক সময়ে আর্থিক ফলাফল উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, এখন সংস্থা লাভের পথে অগ্রসর হচ্ছে এবং পূর্বের ক্ষতির চিত্র ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনকে তিনি মাফিয়া চক্রের দুর্বলতা ও সংশ্লিষ্ট নীতি সংস্কারের ফলাফল হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
উপদেষ্টা জোর দিয়ে বলেন, কোনো ক্ষেত্রেই যদি মাফিয়া গোষ্ঠী শক্তিশালী থাকে, তবে কাজের পরিবেশ কঠিন হয়ে পড়ে এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করে। তিনি নতুন উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়িক অংশীদারদের জন্য সুযোগের দরজা খুলে দিতে হবে, যাতে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সেবা মান ও দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। এধরনের পরিবেশ গড়ে তোলাই দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির মূল চাবিকাঠি।
হোসেন আরও উল্লেখ করেন, গত চৌদ্দ দশক ধরে একই গোষ্ঠীর লোকেরা চট্টগ্রাম বন্দরে আধিপত্য বিস্তার করেছে এবং তাদের কর্মকাণ্ডের প্রভাব ব্যাপকভাবে পরিচিত। এই দীর্ঘস্থায়ী আধিপত্যের ফলে ন্যায্য ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে এবং স্বচ্ছতা কমে গেছে। তিনি এই অবস্থা পরিবর্তনের জন্য কঠোর পদক্ষেপের আহ্বান জানান।
চাঁদাবাজি, অর্থাৎ অবৈধভাবে পণ্য লোডিং ও আনলোডিং, সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়নি, তবে তার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। হোসেনের মতে, পূর্বে এই কাজটি সমষ্টিগতভাবে করা হতো, যেখানে এখন ব্যক্তিগতভাবে করা হচ্ছে। তিনি নিজে গেটের কাছে ট্রাকের প্রবেশের সময় চাঁদা নেওয়া দেখেছেন, যেখানে কেবল বাইরের লোকই নয়, অভ্যন্তরীণ কর্মচারীরাও অংশ নিচ্ছেন। এই অবৈধ কার্যক্রমের পরিমাণ হ্রাস পেতে দেখা গেছে, তবে সম্পূর্ণ নির্মূলের জন্য আরও ব্যবস্থা দরকার।
অবৈধ লোডিং-আনলোডিং কমাতে গেটের প্রবেশ প্রক্রিয়াকে স্বয়ংক্রিয় করার পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমের মাধ্যমে যানবাহনের রেকর্ড, লোডিং সময় ও পরিমাণের সঠিক নজরদারি সম্ভব হবে, যা মাফিয়া গোষ্ঠীর অনুপ্রবেশকে কঠিন করবে। হোসেন এই পদক্ষেপকে ভবিষ্যতে স্বচ্ছ ও নিরাপদ বন্দর পরিচালনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখেন।
সভায় উপস্থিত ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নুরুন্নাহার চৌধুরী, বিএসসির স্বতন্ত্র পরিচালক প্রফেসর এম. শাহজাহান মিনা, ড. আবদুর রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক, বাণিজ্যিক নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আনোয়ার পাশা, প্রযুক্তি নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ ইউসুফ এবং পরিষদ সচিব আবু সাফায়াত মুহাম্মদ শাহেদুল ইসলাম। সকল উপস্থিতি মাফিয়া বিরোধী নীতি ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধির জন্য একমত প্রকাশ করেন।
কমডোর মাহমুদুল মালেক ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংক্ষিপ্ত আর্থিক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, কর সমন্বয়ের পর শিপিং কর্পোরেশনের নিট মুনাফা ৩০৬ কোটি টাকা হয়েছে, যা সংস্থার ইতিহাসে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। এই বিশাল লাভের পেছনে কার্যকরী ব্যবস্থাপনা, মাফিয়া গোষ্ঠীর প্রভাবের হ্রাস এবং স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমের প্রয়োগকে মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
সভা শেষে নৌ উপদেষ্টা মাফিয়া গোষ্ঠীর সম্পূর্ণ নির্মূলের জন্য কঠোর আইনি পদক্ষেপ ও কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, স্বচ্ছতা ও ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে বন্দরের ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত কাজ দরকার। ভবিষ্যতে স্বয়ংক্রিয় গেট সিস্টেম, কঠোর পর্যবেক্ষণ ও নতুন ব্যবসায়িক অংশীদারদের অন্তর্ভুক্তি মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমকে আরও দক্ষ ও নিরাপদ করা সম্ভব হবে।



