লন্ডনের পশ্চিমে বেসওয়াটার এবং কেন্দ্রীয় লন্ডনের সেন্টার পয়েন্ট টাওয়ারে একই রকমের দুটি নতুন ব্যাংকসি চিত্রকর্ম দেখা গেছে। শিল্পী ব্যাংকসি নিজে ইনস্টাগ্রাম পোস্টের মাধ্যমে বেসওয়াটার চিত্রকর্মের স্বত্ব নিশ্চিত করেছেন। চিত্রগুলোতে শীতের পোশাক পরা দুইটি শিশু মাটিতে শুয়ে আকাশের দিকে ইঙ্গিত করছে, যা দৃষ্টিগোচরভাবে দুঃখজনক একটি দৃশ্য উপস্থাপন করে।
বেসওয়াটার চিত্রকর্মটি কুইন্স মিউজের গ্যারেজের উপরে অবস্থিত একটি প্রাচীরের ওপর রঙ করা হয়েছে এবং প্রথমবার সোমবার সড়ক পর্যবেক্ষকরা এটি লক্ষ্য করেন। একই রকমের চিত্রকর্মটি সেন্টার পয়েন্ট টাওয়ারের সামনে শুক্রবার প্রকাশ পায়, যেখানে এটি ব্যস্ত নিউ অক্সফোর্ড স্ট্রিটের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে। যদিও ব্যাংকসির প্রতিনিধিরা শুধুমাত্র বেসওয়াটার কাজের স্বীকৃতি দিয়েছেন, তবে উভয় চিত্রকর্মের সাদৃশ্য স্পষ্টভাবে একই শিল্পীর কাজ নির্দেশ করে।
চিত্রকর্মের বিষয়বস্তু শিশুদের শীতের পোশাক, ওয়েলিংটন বুট, কোট এবং ববলে টুপি, এবং তাদের এক হাতে আকাশের দিকে ইঙ্গিত করা। এই অঙ্গভঙ্গি শিশুরা যেন কোনো দূরবর্তী নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে আছে এমন ধারণা দেয়, যা দর্শকদের মধ্যে গভীর ভাবনা উদ্রেক করে। চিত্রের রঙের ব্যবহার এবং সরল রেখা ব্যাংকসির স্বতন্ত্র স্টাইলের পরিচয় বহন করে, যা শহরের রাস্তায় দ্রুতই নজরে আসে।
স্থানীয় শিল্প সমালোচক ড্যানিয়েল লয়েড-মর্গান এই চিত্রকর্মকে শিশুর গৃহহীনতার প্রতি একটি স্পষ্ট সামাজিক বার্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ব্যস্ত শহরের গলিতে মানুষ এই ধরনের শিল্পকে উপেক্ষা করে, যদিও এটি গৃহহীন শিশুর কষ্টকে দৃশ্যমান করে তুলছে। তার মতে, এই কাজটি এমন একটি স্থান নির্বাচন করেছে যেখানে মানুষ সর্বদা চলাচল করে, ফলে গৃহহীনতার বাস্তবতা আরও তীব্রভাবে প্রকাশ পায়।
লয়েড-মর্গান আরও যোগ করেন, শিশুরা আকাশের দিকে ইঙ্গিত করা যেন তারা কোনো নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে আছে, যা তাদের আশার প্রতীক হতে পারে। তিনি এটিকে ‘নর্থ স্টার’ এর সঙ্গে তুলনা করে বলেন, যে দিকনির্দেশনা গৃহহীন শিশুরা প্রায়ই হারিয়ে ফেলতে পারে, তা পুনরুদ্ধার করার ইঙ্গিত দেয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে চিত্রকর্মটি কেবল শিল্পকর্ম নয়, বরং একটি নৈতিক আহ্বান হিসেবে কাজ করে।
ব্যাংকসি অনুরাগী জেসন টমকিন্সও একই মত প্রকাশ করেন যে, এই চিত্রকর্মটি গৃহহীনতার সমস্যার উপর স্পষ্টভাবে আলোকপাত করে। তিনি উল্লেখ করেন, শহরের ভিড়ের মাঝেও এই ধরনের বার্তা প্রায়শই অদৃশ্য হয়ে যায়, তবে শিল্পের মাধ্যমে তা পুনরায় দৃশ্যমান করা গুরুত্বপূর্ণ।
সেন্টার পয়েন্ট টাওয়ার নিজেই লন্ডনের গৃহহীনতা আন্দোলনের একটি ঐতিহাসিক প্রতীক। ১৯৬৩ সালে অফিস ভবন হিসেবে নির্মিত এই টাওয়ারটি দশকেরও বেশি সময় খালি থাকায় গৃহহীন অধিকার আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। সামাজিক ন্যায়বিচার কর্মীরা এই ভবনকে গৃহহীনদের প্রতি অবহেলার প্রতীক হিসেবে সমালোচনা করে, এবং এর নামকরণ করা হয় গৃহহীনতা সংস্থা ‘সেন্টারপয়েন্ট’ এর নামে, যার প্রতিষ্ঠাতা রেভ. কেন লিচ এই ভবনকে ‘গৃহহীনদের প্রতি অপমান’ বলে উল্লেখ করেন।
পরবর্তীতে টাওয়ারটি উচ্চমানের আবাসিক ইউনিটে রূপান্তরিত হয়, তবে তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং গৃহহীনতার প্রতি সংবেদনশীলতা এখনও শহরের স্মৃতিতে বেঁচে আছে। ব্যাংকসির এই নতুন চিত্রকর্মগুলো সেই স্মৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করে, এবং লন্ডনের বাসিন্দা ও পর্যটকদের মধ্যে গৃহহীন শিশুর সমস্যার প্রতি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে।
সারসংক্ষেপে, বেসওয়াটার ও সেন্টার পয়েন্টে প্রকাশিত একই রকমের দুটি ব্যাংকসি চিত্রকর্ম শহরের গৃহহীনতা সমস্যার উপর একটি শক্তিশালী ভিজ্যুয়াল বার্তা বহন করে। শিল্পের মাধ্যমে সামাজিক সমস্যাকে উন্মোচন করার এই প্রচেষ্টা লন্ডনের রাস্তায় নতুন আলো জ্বালিয়ে দেয় এবং জনসাধারণকে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করে।



