জার্মানির ফেডারেল পাবলিক প্রসিকিউটর জেনারেল অফিস সোমবার একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানায় যে, সিরিয়ার প্রাক্তন নিরাপত্তা কর্মকর্তা ফাহাদ এ-কে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১১ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে তিনি দমাস্কাসের একটি জেলে শতিকো অধিক বন্দীর ওপর শারীরিক নির্যাতন চালিয়েছেন।
প্রসিকিউশন দল জানিয়েছে, ফাহাদ এ-কে ১০০টিরও বেশি জিজ্ঞাসাবাদে অংশ নিতে দেখা গেছে, যেখানে বন্দীদের ওপর বিদ্যুৎ শক, কেবল দিয়ে মারধর, জোরপূর্বক অস্বস্তিকর ভঙ্গি এবং ছাদ থেকে ঝুলিয়ে রাখা সহ বিভিন্ন ধরনের শারীরিক নির্যাতন করা হয়। এইসব নির্যাতনের ফলে জেলটির পরিবেশ অত্যন্ত খারাপ হয়ে ওঠে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্যাতন ও জেলীয় অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে অন্তত ৭০ জন বন্দী মৃত্যুবরণ করে। তাই ফাহাদ এ-কে কেবল নির্যাতনের নয়, সরাসরি হত্যার অভিযোগেও অভিযুক্ত করা হয়েছে।
ফাহাদ এ-কে ২৭ মে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ১০ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগে যুক্ত করা হয়। বর্তমানে তিনি জার্মানির একটি কারাগারে প্রি-ট্রায়াল ডিটেনশনে রয়েছেন, যেখানে তার বিচার প্রক্রিয়া চলমান।
সিরিয়ার জনগণ দীর্ঘদিন ধরে আসাদ শাসনের অধীনে সংঘটিত অপরাধের জন্য ন্যায়বিচার চেয়েছে। দেরি না করে, ডিসেম্বর ২০২৪-এ দ্রুতবর্ধমান বিদ্রোহী বাহিনীর আক্রমণের পর আসাদ সরকার থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। ১৪ বছর দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর এই শাসন শেষ হয়।
আসাদ শাসনকালে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন, বন্দীর নির্যাতন এবং গোপন অপহরণ ঘটেছিল। এই অপরাধগুলোকে আন্তর্জাতিক আদালতে আনা এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিচার করা আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জার্মানি, যেখানে প্রায় এক মিলিয়ন সিরিয়ান বাস করে, সেখানে সর্বজনীন অধিকারবিধি (ইউনিভার্সাল জুরিসডিকশন) ব্যবহার করে বিশ্বব্যাপী মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। এই আইন অনুযায়ী, কোনো দেশের সীমা অতিক্রম করে সংঘটিত অপরাধের জন্যও বিচার করা সম্ভব।
গত কয়েক বছরে জার্মানিতে সিরিয়ান যুদ্ধ অপরাধের সন্দেহে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় ফাহাদ এ-র মতোই অন্যান্য সন্দেহভাজনও অন্তর্ভুক্ত, যাদের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
জুন মাসে ফ্রাঙ্কফুর্টের একটি আদালত সিরিয়ান ডাক্তার আলা মৌসাকে আজীবন কারাদণ্ড দেয়, যাকে আসাদ শাসনের দমনমূলক নীতি অনুসারে সামরিক হাসপাতালগুলোতে রোগী ও রাজনৈতিক বন্দীদের নির্যাতনের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। তার মামলায় সাক্ষীরা নির্যাতনের বিশদ বর্ণনা দেন, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
ফাহাদ এ-র মামলায় এখন পর্যন্ত প্রি-ট্রায়াল পর্যায়ে রয়েছে, তবে আইনগত প্রক্রিয়া দ্রুত অগ্রসর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রসিকিউশন দল উল্লেখ করেছে, প্রমাণ সংগ্রহ এবং সাক্ষী সুরক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায়।
এই মামলাটি সিরিয়ার ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সিগন্যাল, যা দেখায় যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের অনুসরণে অগ্রসর। জার্মানির এই পদক্ষেপ সিরিয়ার দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের পরিণতি মোকাবেলায় একটি নতুন দিক নির্দেশ করে, যেখানে আইনি দায়িত্বের পরিধি জাতীয় সীমানা অতিক্রম করে।



