গত বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকার কারওয়ান বাজারে দেশের শীর্ষ দুই সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়ে সন্ত্রাসী হামলা ঘটেছে। প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টার উভয়ই ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাটের শিকার হয়েছে। হামলার ফলে প্রথম আলো অফিসের বেশিরভাগ কাঠামো ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং ডেইলি স্টার ভবনে অগ্নিকাণ্ডের পর কয়েকজন সাংবাদিক ভবনের ছাদে আটকে থাকে।
হামলার সময় প্রথম আলোর সম্পাদকীয় বিভাগে উপস্থিত সাংবাদিকরা গুলিবর্ষণ ও ভাঙচুরের শিকার হন। অগ্নিকাণ্ডের ফলে অফিসের বেশিরভাগ অংশ ধোঁয়ায় ঢাকা হয়ে যায়। একই সময়ে ডেইলি স্টারের কর্মীরা অগ্নিকাণ্ডের শিখা থেকে বাঁচতে চেষ্টা করার সময় নিরাপত্তা বাহিনীর অনুপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। অগ্নি নির্বাপণ কর্মীরা দেরিতে পৌঁছায়, ফলে কিছু সাংবাদিক ছাদে আটকে থাকে এবং তৎকালীন পরিস্থিতি প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।
ডেইলি স্টারের সম্পাদক নূরুল কবীরকে হেনস্তার শিকার করা হয়। হেনস্থা ঘটার পর তিনি আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। আহতদের মধ্যে অন্যান্য কর্মীও অন্তর্ভুক্ত, যাদের অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানানো হয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর তৎক্ষণাৎ তদন্ত শুরু করে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
হামলার পরপরই দেশের সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকদের সমন্বয়ে গঠিত সম্পাদক পরিষদ এবং নিউজ পেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (নোয়াব) একটি যৌথ প্রতিবাদ সমাবেশের আহ্বান জানায়। সমাবেশটি ঢাকার সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সম্পাদক মাহফুজ আনাম নিরাপত্তা সমস্যার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, সাংবাদিকদের জীবনের নিরাপত্তা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি উল্লেখ করেন, হামলাকারীরা ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর কর্মীদের লক্ষ্য করে গৃহে গৃহে গিয়ে হত্যা করার হুমকি প্রকাশ করেছে, যা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রতিবাদ সমাবেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, পেশাজীবী সংগঠন, ব্যবসায়িক গোষ্ঠী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত হন। তারা সাংবাদিক স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কঠোর ব্যবস্থা চেয়ে একত্রিত হন। সমাবেশের শেষে অংশগ্রহণকারীরা সোনারগাঁও হোটেলের সামনের সড়কে মানববন্ধন গঠন করেন, যা নিরাপদ পরিবেশের প্রয়োজনীয়তা ও ঐক্যের প্রতীক হিসেবে কাজ করে।
অধিক তদন্তের জন্য ঢাকা পুলিশ বিশেষ দল গঠন করে এবং ঘটনাস্থল থেকে প্রমাণ সংগ্রহ শুরু করেছে। ফায়ার ব্রিগেডের রিপোর্ট অনুযায়ী অগ্নিকাণ্ডের মূল কারণ এখনও নির্ধারিত হয়নি, তবে প্রাথমিক বিশ্লেষণে ইলেকট্রিক শোর্টসার্কিটের সম্ভাবনা উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট সকল অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং মামলাটি দ্রুত আদালতে উপস্থাপন করা হবে।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া হুমকি বার্তা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য সাইবার নিরাপত্তা বিভাগও তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। হুমকি বার্তাগুলোতে ডেইলি স্টার এবং প্রথম আলোর সাংবাদিকদের গৃহে গিয়ে হত্যা করার ইচ্ছা প্রকাশ করা হয়েছে, যা নিরাপত্তা সংস্থার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
এই ঘটনার পর সরকারী পর্যায়ে মিডিয়া নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য জরুরি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ক মন্ত্রণালয় একত্রে কাজ করে, সংশ্লিষ্ট মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। এছাড়া, সাংবাদিকদের জন্য নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ ও সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহের বিষয়টি অগ্রাধিকার তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে।
অপরাধের শিকারের সংখ্যা ও ক্ষতির পরিমাণ বিবেচনা করে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে এবং দায়িত্বশীলদের সনাক্ত করে আইনি শাস্তি নিশ্চিত করতে আহ্বান জানানো হয়েছে। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না হলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এ বিষয়টি সকল সংশ্লিষ্ট পক্ষের জন্য স্পষ্ট।
এই ঘটনার পরবর্তী আদালত শোনানির তারিখ এখনও নির্ধারিত হয়নি, তবে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ও মানবাধিকার সংস্থা ইতিমধ্যে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারা দাবি করে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এমন হামলা রোধে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা অপরিহার্য।
সারসংক্ষেপে, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার অফিসে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলা, অগ্নিকাণ্ড এবং হেনস্থা দেশের মিডিয়া নিরাপত্তার দুর্বলতা উন্মোচিত করেছে। সম্পাদক পরিষদ ও নোয়াবের যৌথ প্রতিবাদে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি স্পষ্ট হয়েছে, এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে দ্রুত তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই পরিস্থিতি দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের জীবনের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



