আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিসি) ট্রাইব্যুনাল‑১-এ ২৪ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে একটি গুরুত্বপূর্ণ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ২০২৪ সালের জুলাই‑আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতা আন্দোলন দমনে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের নির্দেশে ২৮৬টি মিথ্যা মামলায় সাড়ে চার লাখের বেশি মানুষকে অভিযুক্ত করার অভিযোগ উপস্থাপন করেন।
শুনানিতে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম, বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদার ও বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের সমন্বয়ে গঠিত প্যানেল মামলার মূল দিকগুলো বিশ্লেষণ করেন। প্রোস্যাকিউশন পাঁচটি পৃথক অভিযোগের ভিত্তিতে মামলাটি গঠন করেছে, যার মধ্যে প্রধানত নীতি নির্ধারণ, মিথ্যা মামলা দায়ের, হত্যাকাণ্ডের জ্ঞান ও উস্কানিমূলক কাজ অন্তর্ভুক্ত।
প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯ জুলাই ২০২৪ তারিখে আনিসুল হক ও তার সহযোগী সালমান এফ রহমান ফোনে আলোচনা করেন যে, আন্দোলনকারীদের শেষ করার জন্য রাতের মধ্যে কারফিউ (বোমা) ব্যবহার করা হবে। এই ফোনালাপের রেকর্ডিং ট্রাইব্যুনালের প্যানেলকে শোনানো হয়, যেখানে আনিসুল হক স্পষ্টভাবে “আজ রাতেই কারফিউ জারির মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের শেষ করতে হবে” বলে উল্লেখ করেন।
দ্বিতীয় অভিযোগে ২২ জুলাই সালমান এফ রহমানের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক নেতাদের সঙ্গে শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতার, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার, বৈঠকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ঐ বৈঠকে ব্যবসায়িকরা “জীবন দিলেও প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন করব” এমন অঙ্গীকার করেন। এরপর আইনমন্ত্রী হকের নির্দেশে ২৮৬টি মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়, যার ফলে সাড়ে চার লাখের বেশি ছাত্র-জনতা অপরাধে অভিযুক্ত হয়। এই মামলাগুলোকে প্রমাণ হিসেবে প্রোস্যাকিউশন উপস্থাপন করেছে।
তৃতীয় অভিযোগে ২৩ জুলাই মিরপুরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের পূর্ব জ্ঞান ও উস্কানির কথা বলা হয়েছে। প্রোস্যাকিউশন দাবি করে যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও দলীয় বাহিনীকে এই হত্যাকাণ্ডে উস্কে দেওয়া হয়েছিল, ফলে বহু ছাত্র-জনতা প্রাণ হারায়।
চতুর্থ অভিযোগে মারণাস্ত্রের ব্যবহারকে উস্কে দেওয়া এবং ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রোস্যাকিউশন অনুযায়ী, ২৮ জুলাই মিরপুর‑১০ এলাকায় আক্তারুজ্জামানকে গুলি করে হত্যা করা হয়, যা আনিসুল হক ও সালমানের উস্কানির ফলাফল বলে দাবি করা হয়েছে।
পঞ্চম অভিযোগে অতিরিক্ত প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে, তবে মূল দিকগুলো ইতিমধ্যে উপরে উল্লেখিত। সব অভিযোগের ভিত্তিতে প্রোস্যাকিউশন ট্রাইব্যুনালকে নির্দেশ দিয়েছে যে, এই কর্মকাণ্ডগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধের শিরোনামে গৃহীত হওয়া উচিত।
আসামিদের মধ্যে তদনুযায়ী, তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, শীর্ষ রাজনৈতিক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, এবং আইনজীবী তৌফিকা আফতাব (তৌফিকা করিম) অন্তর্ভুক্ত। তাদের বিরুদ্ধে মোট পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছে।
শুনানিতে প্রতিপক্ষের কোনো মন্তব্য বা প্রতিরক্ষা উপস্থাপন করা হয়নি; তবে ট্রাইব্যুনাল প্যানেল ভবিষ্যতে প্রতিপক্ষের যুক্তি শোনার সুযোগ দেবে।
এই মামলার ফলাফল বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। যদি দোষী সাব্যস্ত হয়, তবে তৎকালীন সরকার ও তার নীতি নির্ধারকদের ওপর আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হবে এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ দমনমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য সতর্কতা সৃষ্টি হবে। অন্যদিকে, দোষী না হলে সরকারী নীতি ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বৈধতা বজায় থাকবে।
আইসিসি-তে চলমান এই প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়িত্ব নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, যা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমতা ও ন্যায়বিচারকে প্রভাবিত করবে। ভবিষ্যতে ট্রাইব্যুনাল কী সিদ্ধান্ত নেবে তা দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হবে।



