ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার বাহিনীতে লড়াইরত ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যে ২৬ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে, আর সাতজন এখনও অদৃশ্য। এই তথ্য ভারত সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশিত হয়েছে এবং স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়েছে।
মোদি সরকারের মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে যে, রাশিয়ান সেনাবাহিনীতে মোট ২০২ জন ভারতীয় নিয়োগ করা হয়েছিল, যার মধ্যে বিভিন্ন সময়ে কয়েকটি দফা যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে। এই দফাগুলোর মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিখোঁজদের সংখ্যা বাড়ছে।
গত বছর থেকে রাশিয়ার পক্ষে ভারতীয়দের যুদ্ধের তথ্য প্রকাশ্যে আসে, যা প্রথমবারের মতো সরকারী স্তরে স্বীকার করা হয়েছে। হায়দারাবাদের সংসদ সদস্য আসাদুদ্দিন ওয়েইসি পূর্বে অভিযোগ করেন, তেলেঙ্গানা, গুজরাট, কর্ণাটক, জম্মু-কাশ্মীর ও উত্তরপ্রদেশের তরুণদের ইউরোপে চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
প্রশিক্ষণ শেষে এই যুবকদের সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়, যা তাদের পরিবার ও সমাজে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। একবছরেরও বেশি সময় কেটে যাওয়ার পর, তৃণমূল পার্টির সংসদ সদস্য সাকেত গোকলে এবং কংগ্রেসের সংসদ সদস্য রণদীপ সুরজেওয়ালা শীতকালীন অধিবেশনে এই বিষয়টি উত্থাপন করেন।
দুই সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী কীর্তিবর্ধন সিং জানান, রাশিয়ান সেনাবাহিনীতে মোট ২০২ জন ভারতীয় নিয়োগ করা হয়েছিল এবং বিভিন্ন দফায় তাদের প্রাণ হারিয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, রাশিয়া এখনও ভারতীয়দের নিয়োগ বাড়িয়ে চলেছে, যদিও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও সমালোচনা বাড়ছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের তৃতীয় বর্ষে, রাশিয়ান সেনাবাহিনীর ক্ষতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভ্লাদিমির পুতিন প্রেসিডেন্ট অতিরিক্ত সৈন্যবাহিনী গঠনের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিদেশি নাগরিক, বিশেষ করে ভারতীয়দের নিয়োগ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
বহু বিশ্লেষক রাশিয়ার এই কৌশলকে মানবসম্পদ সংকটের সমাধান হিসেবে দেখছেন, তবে একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে সমালোচনা করছেন। একজন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক উল্লেখ করেন, বিদেশি সৈন্যদের নিয়োগ রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে পারে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষতি করতে পারে।
ভারত সরকার এখন পর্যন্ত রাশিয়ার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রাখার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে, তবে ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কূটনৈতিক চ্যানেল সক্রিয় করা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রাশিয়ান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে নিখোঁজদের অবস্থান জানানো এবং বেঁচে থাকা নাগরিকদের প্রত্যাবর্তন সহজ হয়।
ইউক্রেনের যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রাশিয়ার বিদেশি সৈন্য নিয়োগের ওপর চাপ বাড়িয়ে তুলেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের সরকার রাশিয়ার বিরুদ্ধে আর্থিক ও কূটনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে, যা রাশিয়ার সামরিক গঠনকে প্রভাবিত করতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে, ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা ও প্রত্যাবর্তন একটি সংবেদনশীল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারী সূত্র অনুযায়ী, রুশ কর্তৃপক্ষ এখনও সাতজন নিখোঁজ ভারতীয়ের অবস্থান জানাতে পারেনি, যা পরিবারগুলোর মধ্যে অস্থিরতা বাড়িয়ে তুলেছে।
ভবিষ্যতে, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের গতিপথ এবং রাশিয়ার বিদেশি সৈন্য নিয়োগের পরিমাণ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে। ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে, পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার জন্য কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
এই ঘটনাগুলি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, মানবিক অধিকার এবং কূটনৈতিক নীতি সংক্রান্ত বিস্তৃত আলোচনার অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে, যেখানে রাশিয়ার সামরিক কৌশল এবং বিদেশি নাগরিকের ব্যবহার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে আসবে।



