ভারত এবং নিউজিল্যান্ড সরকার সোমবার একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করার ঘোষণা দেয়। দুই দেশ এই চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে আগামী বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে স্বাক্ষর করবে বলে জানায়। যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ নীতি থেকে উদ্ভূত অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় এই চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
চুক্তির মূল শর্ত অনুযায়ী, ভারত নিউজিল্যান্ডে রপ্তানিকৃত সব পণ্যের উপর শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। অপরদিকে, নিউজিল্যান্ডকে ভারতের প্রায় ৭০ শতাংশ ট্যারিফ লাইন থেকে শুল্কে ছাড় এবং বাজারে প্রবেশের সুবিধা প্রদান করা হবে, যা ধীরে ধীরে প্রয়োগ হবে এবং নিউজিল্যান্ডের প্রায় ৯৫ শতাংশ রপ্তানি কভার করবে।
নিউজিল্যান্ডের প্রধান রপ্তানি পণ্য হিসেবে দুগ্ধ, ফল, উল এবং ওয়াইন উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে হর্টিকালচার, কাঠের পণ্য এবং শূকর উলের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি প্রত্যাশিত। এই পণ্যগুলো ভারতীয় বাজারে উচ্চ চাহিদা পায় এবং চুক্তি তাদের রপ্তানি পরিমাণ বাড়াবে।
ভারতের জন্য সবচেয়ে উপকারি সেক্টরগুলো হল টেক্সটাইল ও পোশাক, ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য, চামড়া ও জুতা, এবং সামুদ্রিক পণ্য। শুল্কমুক্ত প্রবেশের ফলে এই শিল্পগুলোকে নতুন বাজারে প্রতিযোগিতা করার সুযোগ মিলবে এবং রপ্তানি আয় বাড়বে।
নিউজিল্যান্ডের পক্ষ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে ভারতীয় বাজারে ২০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, দক্ষ ভারতীয় পেশাজীবীদের নিউজিল্যান্ডের কর্মসংস্থানে সহজ প্রবেশের ব্যবস্থা করা হবে, যা মানবসম্পদ বিনিময়কে ত্বরান্বিত করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অধীনে ট্যারিফ বৃদ্ধি এবং রক্ষা নীতির ফলে বিশ্বব্যাপী দেশগুলো দ্বিপাক্ষিক চুক্তি অনুসন্ধান করছে। এই প্রবণতা ভারতের বাণিজ্য নীতি পরিবর্তনে প্রভাব ফেলেছে, যেখানে নতুন বাজারের সন্ধান এবং রপ্তানি গন্তব্য বৈচিত্র্যকরণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
ভারত সরকার এই চুক্তিকে তার বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছে, যা দেশের অর্থনীতিকে রক্ষা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিবেশের পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নিতে সহায়তা করবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্প্রতি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে দিল্লিতে স্বাগত জানিয়ে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য আলোচনা চালু করেন, যা এই কৌশলের বাস্তবায়নকে ত্বরান্বিত করেছে।
চুক্তি স্বাক্ষরের পর, উভয় দেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট শিল্প ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সঙ্গে সমন্বয় করে বাস্তবায়ন পরিকল্পনা তৈরি করবে। শুল্কমুক্ত পণ্যের তালিকা, কাস্টমস প্রক্রিয়া এবং বিনিয়োগ প্রকল্পের সময়সূচি নির্ধারণের কাজ দ্রুত অগ্রসর হবে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, এই চুক্তি ভারতীয় কৃষি ও উৎপাদন খাতের জন্য নতুন রপ্তানি সুযোগ তৈরি করবে, একই সঙ্গে নিউজিল্যান্ডের উচ্চ মানের পণ্যের জন্য বৃহত্তর বাজার উন্মুক্ত করবে। তবে, শুল্কমুক্ত প্রবেশের ফলে স্থানীয় উৎপাদকদের প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে, যা নীতি সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি করবে।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে, চুক্তি দুই দেশের মোট বাণিজ্য পরিমাণকে শত কোটি ডলার বৃদ্ধি করার সম্ভাবনা রাখে। শুল্কের হ্রাস এবং বাজারের প্রবেশ সহজ হওয়ায় লজিস্টিক খরচ কমবে এবং সরবরাহ শৃঙ্খল আরও কার্যকর হবে।
দীর্ঘমেয়াদে, এই চুক্তি ভারতের বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ককে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সম্প্রসারিত করতে সহায়তা করবে, যেখানে নিউজিল্যান্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। একই সঙ্গে, নিউজিল্যান্ডের জন্য ভারতীয় বাজারের বিশাল ভোক্তা ভিত্তি নতুন বিক্রয় চ্যানেল খুলে দেবে।
সারসংক্ষেপে, ভারত-নিউজিল্যান্ড ফ্রি ট্রেড চুক্তি উভয় দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থকে সমন্বিত করে একটি কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলবে। শুল্কমুক্ত প্রবেশ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং মানবসম্পদ বিনিময় এই চুক্তির মূল স্তম্ভ, যা ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করবে।



