বাংলাদেশ এবং জাপান আজ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (EPA) সম্পর্কিত যৌথ ঘোষণার আয়োজন করেছে, যা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিসর বাড়ানোর লক্ষ্য রাখে। বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমানের মতে, ঘোষণাটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত হবে এবং তা দেশের অর্থনৈতিক কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।
ঘোষণার অনুষ্ঠানে বাণিজ্য উপদেষ্টা স্ক. বশির উদ্দিন এবং জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী তশিমিতসু মোতেগি ফোনের মাধ্যমে সংযোগ স্থাপন করে চুক্তির মূল বিষয়গুলো উপস্থাপন করবেন। ঘোষণার পর একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হবে, যেখানে EPA-র বিশদ শর্তাবলী ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা উল্লেখ থাকবে।
প্রাথমিকভাবে এই চুক্তি এই মাসে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল, তবে জাপানের জাতীয় সংসদ (ডায়েট) থেকে চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার পরই চূড়ান্ত নথি স্বাক্ষরিত হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। অনুমান অনুযায়ী স্বাক্ষর জানুয়ারি মাসে সম্পন্ন হতে পারে, যা চুক্তির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের সূচনা চিহ্নিত করবে।
EPA বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করবে, যা পূর্বে শুধুমাত্র ভুটানের সঙ্গে ২০২০ সালে স্বাক্ষরিত এবং ২০২২ থেকে কার্যকর হওয়া পছন্দসই বাণিজ্য চুক্তি (PTA) ছাড়া অন্য কোনো সমগ্র চুক্তি ছিল না। এই নতুন চুক্তি দ্বিপাক্ষিক শুল্ক হ্রাস, সেবা খাতের প্রবেশাধিকার এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার সম্ভাবনা রাখে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ভুটানের সঙ্গে একমাত্র PTA বজায় রেখেছে, যা ডিসেম্বর ২০২০-এ স্বাক্ষরিত এবং জুলাই ২০২২ থেকে কার্যকর হয়েছে। এই সীমিত চুক্তি মূলত পণ্য রপ্তানি ও সীমিত সেবা ক্ষেত্রে সুবিধা প্রদান করে, তবে EPA-র মাধ্যমে জাপানের বৃহৎ বাজারে প্রবেশের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
দেশটি লেস্ট ডেভেলপড কান্ট্রি (LDC) থেকে উন্নত দেশ হিসেবে পরিবর্তনের পথে রয়েছে এবং আগামী ২৪ নভেম্বর LDC থেকে ডেভেলপিং কান্ট্রি হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। এই পরিবর্তনের আগে বাংলাদেশ প্রায় এক ডজনেরও বেশি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে LDC-সম্পর্কিত বাণিজ্য সুবিধা হারানোর ঝুঁকি কমানো যায়।
বিশ্লেষকরা অনুমান করেন, যদি দেশটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে নতুন চুক্তি না করে, তবে LDC সুবিধা হারিয়ে বছরে প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার বা রপ্তানির ১৪ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে। তাই EPA-র স্বাক্ষর ও বাস্তবায়ন দেশের রপ্তানি আয় রক্ষা ও বৃদ্ধির জন্য কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে EPA জাপানের উচ্চ প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি ও সেবা খাতের সঙ্গে বাংলাদেশের টেক্সটাইল, কৃষি ও হালকা শিল্পের সংযোগকে শক্তিশালী করবে বলে আশা করা হচ্ছে। শুল্ক হ্রাস ও বাজার প্রবেশের সহজতা উভয় দেশের ব্যবসায়িক সম্প্রসারণে সহায়তা করবে, বিশেষত জাপানি সরাসরি বিনিয়োগ (FDI) বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে চুক্তির চূড়ান্ত অনুমোদন জাপানের সংসদে পাস না হলে স্বাক্ষরের সময়সূচি পিছিয়ে যেতে পারে, যা বাংলাদেশের LDC-গ্র্যাজুয়েশন পূর্বে বাণিজ্যিক সুবিধা নিশ্চিত করার পরিকল্পনাকে প্রভাবিত করতে পারে। সময়মতো অনুমোদন না হলে রপ্তানি শিল্পের পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে এবং বিকল্প বাজার অনুসন্ধানে চাপ বাড়বে।
অন্যদিকে, সংবাদপত্রের মালিকদের সংগঠন নোয়াবের সভাপতি এ.কে. আজাদ জানিয়েছেন, জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে ঢাকায় সারা দেশের সাংবাদিকদের নিয়ে একটি বৃহৎ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এই সম্মেলনের মাধ্যমে EPA ও অন্যান্য বাণিজ্য চুক্তির অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হবে এবং পরবর্তী পদক্ষেপের ঘোষণা করা হবে।
সারসংক্ষেপে, বাংলাদেশ-জাপান EPA ঘোষণার মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত হচ্ছে। চুক্তির স্বাক্ষর ও কার্যকরী হওয়া দেশের রপ্তানি রক্ষা, নতুন বাজারে প্রবেশ এবং LDC-গ্র্যাজুয়েশন পরবর্তী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।



