জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম গত সোমবার ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের পদ্মা মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘মব ভায়োলেন্সে আক্রান্ত বাংলাদেশ’ শীর্ষক যৌথ প্রতিবাদ সভায় সাম্প্রতিক হিংসাত্মক ঘটনার পেছনে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দেন। তিনি উল্লেখ করেন, জুলাই আন্দোলন ও তার পরবর্তী সময়ে গড়ে তোলার প্রত্যাশিত নতুন বাংলাদেশের ধারণা এখন বাস্তবায়িত হচ্ছে না, যা দেশের জন্য দুর্ভাগ্যজনক।
এই প্রতিবাদ সভা নিউজপেপার্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) ও সম্পাদক পরিষদের সমন্বয়ে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারসহ প্রধান সংবাদপত্রগুলোকে লক্ষ্য করে সাম্প্রতিক হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়। নোয়াব ও সম্পাদক পরিষদ এই ঘটনাগুলোকে একত্রে মোকাবেলা করার জন্য এই সভা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
নাহিদের মতে, প্রথম আলো, ডেইলি স্টার এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আক্রমণকারী গোষ্ঠী জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্লোগান, শহীদদের নাম এবং আন্দোলনের ভাষা ব্যবহার করে জনমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই ধরনের রেটোরিক্সের মাধ্যমে সহিংসতার পক্ষে সামাজিক সমর্থন গড়ে তোলার উদ্দেশ্য স্পষ্ট।
বক্তা আরও উল্লেখ করেন, এই হামলায় কয়েক হাজার মানুষ জড়িত ছিল, যা একক ঘটনা নয়, বরং পূর্বপরিকল্পিত একটি বৃহৎ কাণ্ডের অংশ। তিনি যুক্তি দেন, জুলাই আন্দোলনের সময় সক্রিয় ছিলেন এমন ব্যক্তিদের এই ঘটনার দায়িত্ব বেশি, কারণ তারা প্রাথমিকভাবে আন্দোলনের রূপান্তরকে কাজে লাগিয়ে এখনো অব্যাহত সহিংসতায় ভূমিকা রাখছে।
নাহিদের মন্তব্যে তিনি অতিরিক্তভাবে উল্লেখ করেন, বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা দুর্বল ছিল, এবং সেই শূন্যতা ব্যবহার করে এখন পরিকল্পিত অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। তিনি সতর্ক করেন, বর্তমান পরিস্থিতি দেশের রাজনীতি ও নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে নির্দিষ্ট কোনো দিকের দিকে ধাক্কা দিতে চায়।
প্রতিবাদ সভায় উপস্থিত অন্যান্য রাজনৈতিক ও মিডিয়া প্রতিনিধিরা নাহিদের বক্তব্যকে সমর্থন করে জানান, সাম্প্রতিক হামলা কেবল মিডিয়ার স্বাধীনতাকে নয়, দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তারা দাবি করেন, এই ধরনের হিংসা রোধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর দ্রুত ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপ প্রয়োজন।
প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারী সাংবাদিক ও সম্পাদকরা উল্লেখ করেন, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ওপর আক্রমণ কেবল সম্পত্তি ক্ষতি নয়, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর আক্রমণ। তারা জোর দিয়ে বলেন, এমন ঘটনা যদি অব্যাহত থাকে তবে দেশের তথ্যপ্রাপ্তি ও মত প্রকাশের অধিকার ক্ষুণ্ণ হবে।
নোয়াবের প্রতিনিধিরা উল্লেখ করেন, এই ধরনের হিংসা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মিডিয়া সংস্থাগুলোকে সুরক্ষিত রাখতে আইনসভার ও সরকারী স্তরে প্রয়োজনীয় নীতি তৈরি করা জরুরি। তারা দাবি করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মিডিয়া কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
নাহিদের বক্তব্যের পর, কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইঙ্গিত করেন, যদি এই ধরনের পরিকল্পিত সহিংসতা রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য ব্যবহার করা হয়, তবে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তারা উল্লেখ করেন, নির্বাচনের আগে এমন ঘটনা রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশলগত পদক্ষেপের অংশ হতে পারে, যা ভোটারদের মনোভাবকে প্রভাবিত করতে পারে।
অধিকন্তু, আইনশৃঙ্খলা সংস্থার প্রতিনিধিরা এই ধরনের ঘটনার তদন্তে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি জানান। তারা উল্লেখ করেন, অপরাধের দায়ী ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের শাসন নিশ্চিত করা হবে।
এই সভা এবং নাহিদের মন্তব্যের পর, দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোও সমানভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা দাবি করেন, হিংসা ও অশান্তি দূর করতে সকল রাজনৈতিক দলকে সংলাপের মাধ্যমে সমাধান খুঁজতে হবে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে রক্ষা করতে একসাথে কাজ করতে হবে।
সামগ্রিকভাবে, নাহিদের বক্তব্য এবং প্রতিবাদ সভা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরেছে। ভবিষ্যতে যদি এই ধরণের পরিকল্পিত সহিংসতা অব্যাহত থাকে, তবে তা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই, সকল সংশ্লিষ্ট পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টা এবং দ্রুত আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা জরুরি।



