অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম, সোমবার তার নিশ্চিত ফেসবুক প্রোফাইলে দেশের নিঃশব্দ বীরদের অবদান তুলে ধরেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, দুই দিনে তিনি তিনটি জানাজায় অংশগ্রহণ করেছেন, যার মধ্যে তরুণ রাজনীতিবিদ শরিফ ওসমান হাদির শেষকৃত্য অন্তর্ভুক্ত। একই পোস্টে তিনি সুদানে এক ড্রোন আক্রমণে নিহত ছয়জন বাংলাদেশী শান্তিরক্ষীর নামও প্রকাশ করেন। শফিকুল আলমের এই মন্তব্যগুলো দেশের অভ্যন্তরে ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের শান্তি রক্ষাকারী শক্তির স্বীকৃতি বাড়াতে পারে।
শফিকুল আলমের ফেসবুক পোস্টে তিনি প্রথমে দেশের ‘নিবৃতচারী বীর’দের কথা তুলে ধরেছেন, যারা দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বব্যাপী শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কাজ করছেন। তিনি বলেন, এই বীরদের পরিচয় প্রায়শই গোপন থাকে, তবে তাদের ত্যাগ ও সেবা দেশের গৌরবের অংশ। পোস্টে তিনি নিজে দুই দিনে তিনটি জানাজায় অংশ নেওয়ার কথা উল্লেখ করে, এই বীরদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের গুরুত্ব জোর দেন।
প্রথম জানাজায় অংশ নেওয়া হয় তরুণ রাজনীতিবিদ শরিফ ওসমান হাদির জন্য, যাকে শফিকুল আলম ‘একজন তরুণ বীর’ হিসেবে বর্ণনা করেন। হাদি রাজনৈতিক মঞ্চে ন্যায়ের স্বর হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং তার শেষকৃত্যতে লক্ষ লক্ষ মানুষ, কিছু সূত্রে দশ লক্ষেরও বেশি, অংশগ্রহণ করেন। এই বিশাল অংশগ্রহণ তার জনমনে গভীর প্রভাব ও জনপ্রিয়তা নির্দেশ করে, যা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে বলে বিশ্লেষণ করা হয়।
শরিফ ওসমান হাদির তেজোচ্ছল ভাষণ ও বাগ্মী শৈলী ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ‘বিদ্রোহী’দের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে বলে শফিকুল আলম উল্লেখ করেন। হাদির নিঃস্বার্থ কর্মদক্ষতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতি তার অবিচলতা, দেশের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নতুন দিকনির্দেশনা প্রদান করবে বলে তিনি আশাবাদী।
সুদানে এক ড্রোন হামলায় ছয়জন বাংলাদেশী শান্তিরক্ষী নিহত হওয়ার খবরও শফিকুল আলমের পোস্টে উঠে আসে। এই শিহরণজনক ঘটনার শিকাররা দেশের শান্ত গ্রাম থেকে আসা ‘নিবৃতচারী বীর’, যাদের মধ্যে স্বামী, বাবা, মা এবং সন্তানদের মতো ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মানুষ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। শফিকুল আলমের মতে, তাদের শেষ বিদায়কে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও গম্ভীরভাবে পরিচালনা করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ও জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা এই শহীদদের ত্যাগকে স্মরণ করে, যারা অস্থির পরিবেশে শান্তি ফিরিয়ে আনতে প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। পরিবার, সহকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা শহীদদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণে একত্রিত হয়ে শোক প্রকাশ করেছেন। শফিকুল আলমের মন্তব্যে এই শহীদদের কাজকে দেশের গর্বের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
শফিকুল আলমের পোস্টে আরেকজন বীরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যিনি গৌরবময় বায়ু যুদ্ধের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন – আবদুল করিম খন্দকার, যাকে এ কে খন্দকার নামেও চেনা যায়। তিনি গার্ডিয়ান ডিভিশনের পাইলট ছিলেন এবং প্রায় ৩,৪০০ ঘণ্টা যুদ্ধবিমান চালিয়েছেন। তার কাজের পরিধি বিস্তৃত হলেও, তিনি সাধারণত পরিবারের সঙ্গে সন্ধ্যা কাটাতে পছন্দ করতেন এবং বাইরে খাবার বা আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়া তার স্বভাবের অংশ ছিল না।
তবু, যখন মাতৃভূমি মুক্তির ডাক শোনায়, তখন এ কে খন্দকারের শান্ত ও সংযত স্বভাবের বিপরীতে তিনি পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বায়ু বাহিনীর বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। তার এই সিদ্ধান্ত দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল। শফিকুল আলমের মতে, এ কে খন্দকারের অবদানকে ‘কিলো ফ্লাইট’ নামে পরিচিত একটি বিশেষ মিশন হিসেবে স্মরণ করা হয়, যা মুক্তিযুদ্ধের সময় এক গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ভূমিকা পালন করেছিল।
‘কিলো ফ্লাইট’ মিশনটি মুক্তিবাহিনীর বায়ু শক্তি গড়ে তোলার জন্য গৃহীত একটি পরিকল্পনা, যেখানে এ কে খন্দকারের নেতৃত্বে ছোট সংখ্যক বিমান ব্যবহার করে শত্রুর উপর আক্রমণ চালানো হয়। এই মিশনটি যুদ্ধের ধারাকে পরিবর্তন করে এবং স্বাধীনতার পথে নতুন দিকনির্দেশনা প্রদান করে। শফিকুল আলমের বিশ্লেষণে এ কে খন্দকারের ত্যাগ ও বীরত্বকে দেশের বায়ু শক্তির ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
শফিকুল আলমের এই পোস্টের মাধ্যমে সরকার ও জনগণের মধ্যে বীরদের নিঃশব্দ অবদানের প্রতি সচেতনতা বাড়ার সম্ভাবনা দেখা যায়। তিনি ভবিষ্যতে সরকারকে এই বীরদের সম্মানসূচক পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানান, যেমন জাতীয় স্মারক স্থাপন, পরিবারকে আর্থিক সহায়তা এবং বীরদের নাম দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা হাসপাতাল নামকরণ। এ ধরনের উদ্যোগ দেশের আন্তর্জাতিক শামিলতা ও শান্তি রক্ষার প্রচেষ্টাকে শক্তিশালী করবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বীরত্বের মূল্যবোধ শিখাবে।
শফিকুল আলমের মন্তব্যের পর, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন যে, বীরদের স্বীকৃতি ও সম্মান দেশের অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও আন্তর্জাতিক মর্যাদা উভয়ই বাড়াতে পারে। বিশেষ করে, শান্তি রক্ষাকারী শহীদদের স্মরণে জাতীয় স্তরে সমাবেশ ও শোকস্মরণী আয়োজন করা, দেশের মানবিক দায়িত্ববোধকে দৃঢ় করবে। এ ধরনের পদক্ষেপের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার ‘বীরদের দেশ’ হিসেবে পরিচিতি আরও সুদৃঢ় করতে পারবে।



