ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আজ (২২ ডিসেম্বর) জেনিনের পশ্চিমে রায়ান এলাকায় একটি কিশোরকে ইট ছোড়ার অভিযোগে ইসরায়েলি সেনা কাছ থেকে গুলি করে মারার পর রক্তক্ষরণে স্থানেই মৃত্যুবরণ করে। গুলিবিদ্ধের পর অ্যাম্বুলেন্স কর্মীরা তাকে হাসপাতালে পৌঁছাতে বাধা পায়, ফলে চিকিৎসা সেবা সময়মতো পৌঁছাতে না পারায় তার জীবন শেষ হয়। পরে ইসরায়েলি বাহিনী তার দেহ হেফাজতে নিয়ে যায়।
একই দিনে, জেনিনের পশ্চিমে সিলাত আল-হারিথিয়া অঞ্চলে আরেকটি ঘটনা ঘটেছে। ২২ বছর বয়সী আহমেদ জাইয়ুদকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গুলি করে হত্যা করেছে। সেনাবাহিনীর বিবরণে বলা হয়েছে, জাইয়ুদ সেনাদের দিকে একটি বিস্ফোরক নিক্ষেপের চেষ্টা করছিল। এই দুই ঘটনার মধ্যে সংযোগের ইঙ্গিত না দিলেও, উভয়ই পশ্চিম তীরে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি নির্দেশ করে।
গাজা যুদ্ধের সূচনা থেকে পশ্চিম তীরে সহিংসতা তীব্রতর হয়েছে। যদিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপের ফলে সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে, তবু গুলিবিদ্ধ, গৃহবন্দি এবং বসতি স্থাপনকারীদের দ্বারা আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গাজা যুদ্ধের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের হাতে এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে।
বিশেষ করে এই বছরের জানুয়ারি থেকে বর্তমান পর্যন্ত, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে ৫১ নাবালক প্রাণ হারিয়েছে। এই সংখ্যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা এই ঘটনাগুলোর প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একটি ইউরোপীয় কূটনীতিক উল্লেখ করেছেন, “পশ্চিম তীরে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের মান বজায় রাখা জরুরি।” একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের একটি দাপ্তরিক সূত্র জানিয়েছে, ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য অতিরিক্ত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা প্রয়োগ করা হবে।
অঞ্চলীয় বিশ্লেষকরা এই ঘটনাগুলোকে গাজা যুদ্ধের পরবর্তী পর্যায়ের অংশ হিসেবে দেখছেন। তারা উল্লেখ করেন, গাজা অঞ্চলে সামরিক সংঘর্ষের তীব্রতা কমলেও, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ ও নিরাপত্তা অপারেশন বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য হুমকি স্বরূপ। বিশেষ করে, জেনিনের আশেপাশের এলাকাগুলো ঐতিহাসিকভাবে উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু, এবং এখানে ঘটিত গুলিবিদ্ধ ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।
ইসরায়েলি সরকার পক্ষ থেকে, নিরাপত্তা বাহিনীর বিবরণে বলা হয়েছে, গুলিবিদ্ধ কিশোরের ক্ষেত্রে ইট ছোড়ার অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত প্রতিক্রিয়া নেওয়া হয়েছে, এবং আহমেদ জাইয়ুদের ক্ষেত্রে বিস্ফোরক নিক্ষেপের প্রচেষ্টা রোধের জন্য গুলি করা হয়েছে। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই ব্যাখ্যাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, কারণ গুলিবিদ্ধের সুনির্দিষ্ট স্থান ও সময়ের ভিডিও প্রমাণ এখনও প্রকাশিত হয়নি।
ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই ঘটনাগুলো পশ্চিম তীরে শান্তি আলোচনার জটিলতা বাড়িয়ে তুলছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপের ফলে ইসরায়েলি সরকারকে নিরাপত্তা অপারেশন ও মানবিক দায়িত্বের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখতে হবে। পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পশ্চিম তীরে ভ্রমণ পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং সম্ভাব্য শান্তি উদ্যোগের জন্য পরামর্শ প্রদান করা যায়।
সারসংক্ষেপে, আজকের গুলিবিদ্ধ কিশোর ও ২২‑বছরীর মৃত্যু পশ্চিম তীরে অব্যাহত সহিংসতার নতুন উদাহরণ। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও প্রধান শক্তিগুলোর কাছ থেকে ত্বরিত প্রতিক্রিয়া ও পর্যবেক্ষণ দাবি করা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধ করা যায় এবং দীর্ঘমেয়াদী শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য একটি স্থিতিশীল পরিবেশ গড়ে তোলা যায়।



