থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার সীমান্তে নতুন গুলিবর্ষণ ঘটেছে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিদেশ মন্ত্রীদের মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত হওয়া শীর্ষ সম্মেলনের ঠিক আগে ঘটেছে। এই উত্তেজনা জুলাই মাসে মালয়েশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে গৃহীত সাময়িক যুদ্ধবিরতির পুনরায় নিশ্চিতকরণকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। সংঘর্ষের পুনরারম্ভ ৮ ডিসেম্বর থেকে হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে, পাশাপাশি দুই দেশের সীমান্তে প্রায় এক মিলিয়ন মানুষ স্থানচ্যুত হয়েছে।
কম্বোডিয়ার জাতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সোমবার থাইল্যান্ডকে এয়ার স্ট্রাইক চালিয়ে বান্তে মিয়ানচে প্রদেশে চারটি বোমা ফেলেছে এবং প্রে চ্যান গ্রামাঞ্চলে “বিষাক্ত গ্যাস” ব্যবহার করার অভিযোগ জানায়। মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে যে, কম্বোডিয়ান সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং দেশের ভূখণ্ডের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
থাইল্যান্ডের টেলিভিশন চ্যানেল ৩-এ রিপোর্ট করা হয়েছে যে, সা ক্যাও প্রদেশে গুলিবর্ষণ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কম্বোডিয়ান বাহিনী ভারী অস্ত্র ব্যবহার করে খোক সুং জেলার বাড়িগুলোকে আগুনে জ্বালিয়ে দেয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত করে। থাই সরকার এখনো এই নতুন সংঘর্ষ সম্পর্কে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।
কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন মানেতের অফিস সোমবার জানিয়েছে যে, গত রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কম্বোডিয়ান দিকের প্রায় ৫,২৫,০০০ নাগরিক স্থানচ্যুত হয়েছে। থাই কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, থাইল্যান্ডে প্রায় ৪,০০,০০০ মানুষ তাদের বাড়ি ছেড়ে গিয়ে শরণার্থী অবস্থায় রয়েছে। উভয় পক্ষের শরণার্থী সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে মানবিক সহায়তার চাহিদা তীব্রতর হচ্ছে, এবং সীমান্তবর্তী শিবিরগুলোতে মৌলিক সেবার অভাব দেখা দিচ্ছে।
থাই প্রধানমন্ত্রী আনুটিন চার্নভিরাকুল জোর দিয়ে বলেছেন যে, থাইল্যান্ড কখনোই আক্রমণকারী ভূমিকা পালন করেনি এবং পূর্বে কম্বোডিয়ান বাহিনী দ্বারা দখল করা বেশিরভাগ এলাকা এখন পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন যে, উভয় দেশই শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথে অগ্রসর হোক।
মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে ASEAN-র বিদেশ মন্ত্রীরা শীঘ্রই একত্রিত হয়ে থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া সংঘাতের সমাধান নিয়ে আলোচনা করবে। এই বৈঠকে ১৯৭৬ সালের আঞ্চলিক নিরাপত্তা চুক্তি এবং পূর্বে জুলাই মাসে গৃহীত যুদ্ধবিরতির শর্তাবলী পুনর্বিবেচনা করা হবে। পূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উদ্যোগে গৃহীত এই যুদ্ধবিরতি এখনো সম্পূর্ণভাবে কার্যকর হয়নি, এবং উভয় পক্ষের সামরিক পদক্ষেপ তা ক্ষুণ্ন করেছে।
একজন আন্তর্জাতিক কূটনীতিকের মতে, “ASEAN-এর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই ধরনের সীমান্তীয় সংঘাতের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়; আঞ্চলিক সংহতি ও যৌথ নিরাপত্তা কাঠামোই একমাত্র কার্যকর পথ।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই মুহূর্তে থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে বিশ্বাসের ফাঁক পূরণ করা এবং মানবিক সহায়তা দ্রুত সরবরাহ করা জরুরি।
এই সংঘর্ষের ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিবেশে অস্থিরতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্য ও পর্যটন প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষত, সীমান্ত পারাপার ও বাণিজ্যিক রুটগুলোতে সম্ভাব্য বন্ধের ঝুঁকি রয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে প্রভাবিত করবে।
পরবর্তী সপ্তাহে ASEAN-র শীর্ষ সম্মেলনে থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার প্রতিনিধিদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে, যেখানে যুদ্ধবিরতির পুনঃনিশ্চয়তা, শরণার্থীদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন এবং সীমান্তে পর্যবেক্ষণ মিশনের সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরদারি ও সমর্থন এই প্রক্রিয়াকে সফল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সামগ্রিকভাবে, বর্তমান উত্তেজনা কেবল দুই দেশের মধ্যে সীমান্তীয় বিরোধ নয়, বরং আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দ্রুত কূটনৈতিক পদক্ষেপ এবং মানবিক সহায়তার সমন্বিত ব্যবস্থা ছাড়া পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে, এবং ASEAN-র নেতৃত্বে সমন্বিত সমাধানই একমাত্র কার্যকর পথ হিসেবে দেখা হচ্ছে।



