নওগাঁ শহরের ধর্মতলা রোডের আটাপট্টিতে অবস্থিত সাব্বীর হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভোজনরসিকদের আকর্ষণ করে চলেছে। বিরিয়ানি, খাসির বিরিয়ানি এবং মোরগ পোলাওয়ের স্বাদ ও গন্ধে এই প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় বাজারে স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে তুলেছে।
হোটেলটি ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠাতা ইদ্রিস আনছারী প্রাথমিকভাবে রুটি, পরোটা, ডাল এবং চা বিক্রি করতেন; তার কিশোর বয়সের ছেলে সাব্বীর আনছারী খাবার পরিবেশন করে ব্যবসা চালাতেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মেনুতে কাঁচি, ভাত, মাছ-মাংসের পদ এবং বিভিন্ন মিষ্টি ও দই যুক্ত হয়।
১৯৭৪ সালে সাব্বীর আনছারীর জন্মের পর, ১৯৮০ সালে তিনি বাবার দোকানে ছয় বছর কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। একই বছর একটি ব্যবসায়ীর অনুষ্ঠানের জন্য মোরগ পোলাও অর্ডার পাওয়ার পর, ইদ্রিসের পরামর্শে সাব্বীর দুই কেজি চালের পোলাও ও দশটি মুরগি রান্না করেন। যদিও প্রথমে গ্রাহক না আসলেও, স্থানীয় যুবক মোশতাকের স্বাদগ্রাহ্যতা ব্যবসার মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
মোশতাক পোলাও ও মুরগির রোস্টের স্বাদে মুগ্ধ হয়ে তার বন্ধুদের সঙ্গে ফিরে আসেন এবং সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত বহু গ্রাহক একই খাবার উপভোগ করেন। ঐ সময় পোলাও-মাংসের দাম ছিল মাত্র তেরো টাকা, যা স্থানীয় ক্রেতাদের জন্য সাশ্রয়ী বিকল্প হিসেবে কাজ করে। এই ঘটনাটি হোটেলের জনপ্রিয়তা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বছরের পর বছর, সাব্বীর হোটেল তার মূল পণ্য—বিরিয়ানি—কে কেন্দ্র করে ব্র্যান্ড গড়ে তুলেছে। শহরের ব্যস্ততম এলাকায় অবস্থিত হওয়ায়, গ্রাহকরা যানজট পার হয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে সময়ের লড়াই করেন, এবং টেবিল খালি পাওয়াও কখনো কখনো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। তবুও, একবার খাবার চেখে দেখলে গ্রাহকরা সব কষ্ট ভুলে যান।
বিরিয়ানির স্বাদ, গন্ধ এবং মানের কারণে নওগাঁয়ের বাইরে অন্যান্য শহর ও গ্রাম থেকে মানুষ নিয়মিত এই হোটেলে আসেন। হোটেলটি স্থানীয় রেস্টুরেন্ট বাজারে একটি মানদণ্ড স্থাপন করেছে, যেখানে প্রতিযোগীরা একই মানের খাবার সরবরাহে চাপ অনুভব করে। এর ফলে নওগাঁয়ের খাদ্য শিল্পে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ বেড়েছে।
সাব্বীর হোটেলের মেনুতে কাঁচি, ভাত, মাছ-মাংসের পদ এবং বিভিন্ন মিষ্টি ও দই অন্তর্ভুক্ত, যা গ্রাহকদের বহুমুখী পছন্দের সুযোগ দেয়। এই বৈচিত্র্য স্থানীয় বাজারে বিক্রয় পরিমাণ বাড়িয়ে তুলেছে এবং হোটেলের দৈনিক আয় স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করেছে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, হোটেলের দীর্ঘমেয়াদী সাফল্য তার ধারাবাহিক গুণমান বজায় রাখার ক্ষমতা এবং গ্রাহক সন্তুষ্টির ওপর নির্ভরশীল। ৫০ বছরের বেশি সময়ে হোটেলটি বহু প্রজন্মের গ্রাহকের আস্থা অর্জন করেছে, যা পুনরাবৃত্তি ব্যবসা এবং মুখে মুখে প্রচারের মাধ্যমে বিক্রয় বাড়িয়ে তুলেছে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, হোটেলের সফলতা স্থানীয় সরবরাহ চেইনকে শক্তিশালী করেছে। চাল, মুরগি, মসলা এবং অন্যান্য উপাদানের চাহিদা বাড়ার ফলে নিকটস্থ কৃষক ও সরবরাহকারীদের আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে, হোটেলটি স্থানীয় কর্মসংস্থানেও অবদান রাখে, যেখানে রান্না, পরিষেবা এবং ব্যবস্থাপনা বিভাগে বহু কর্মী নিয়োজিত।
হোটেলের অবস্থান ধর্মতলা রোডের আটাপট্টিতে হওয়ায়, শহরের প্রধান ট্র্যাফিক রুটের কাছাকাছি থাকায়, ব্যবসায়িক সময়ে গ্রাহক প্রবাহ উচ্চ থাকে। তবে, যানজটের কারণে প্রবেশে সময়সীমা বাড়ে, যা হোটেলকে পার্কিং ও প্রবেশ পথ উন্নত করার প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে। এই বিষয়টি ভবিষ্যতে অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে সমন্বয় করে সমাধান করা যেতে পারে।
সাব্বীর হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের ব্র্যান্ডিং কৌশলও উল্লেখযোগ্য। হোটেলের নাম এবং বিরিয়ানির গুণমান একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছে। এই পরিচয় গ্রাহকদের মধ্যে উচ্চ প্রত্যাশা তৈরি করে, যা হোটেলকে মান বজায় রাখতে এবং নতুন মেনু আইটেম যোগ করতে উদ্বুদ্ধ করে।
ভবিষ্যৎ দৃষ্টিতে, হোটেলটি তার বাজার শেয়ার বজায় রাখতে এবং সম্প্রসারণের সম্ভাবনা অনুসন্ধান করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ডেলিভারি সেবা বা শাখা সম্প্রসারণের মাধ্যমে বৃহত্তর গ্রাহক গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করা সম্ভব। তবে, গুণমানের ধারাবাহিকতা এবং মূল স্বাদ বজায় রাখা মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে যাবে।
সারসংক্ষেপে, নওগাঁয়ের সাব্বীর হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের বিরিয়ানি ব্যবসা স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ৫০ বছরের ঐতিহ্য, স্বাদে পার্থক্য, এবং গ্রাহক সন্তুষ্টি হোটেলকে বাজারে অগ্রগামী অবস্থানে রাখে। ভবিষ্যতে অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই সাফল্যকে আরও বাড়ানো সম্ভব।



