২২ ডিসেম্বর, হাঙ্গেরি তার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তকে স্মরণ করে—বুদাপেস্টের মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রামের দশকগুলো। এই দিনটি দেশের জন্য কেবল একটি ঐতিহাসিক তারিখ নয়, বরং বহুবার পুনরায় উঠে দাঁড়ানোর সংকল্পের প্রতীক। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে হাঙ্গেরির স্বাধীনতা সংগ্রাম ইউরোপের নিরাপত্তা ও গণতন্ত্রের বিকাশে কী ভূমিকা রেখেছে, তা আজও বিশ্লেষণ করা হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে, ১৯৪৪ সালের ডিসেম্বর মাসে বুদাপেস্ট নাজি জার্মানি ও তার স্থানীয় সহযোগীদের হাতে কঠোর অবরোধের মুখে পড়ে। শহরটি কেল্লার মতো রূপান্তরিত হয়ে, নাগরিকদের জন্য দৈনন্দিন জীবনের সব দিকই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। একই সময়ে, সোভিয়েত রেড আর্মি শহরের চারপাশে ঘূর্ণায়মান হয়ে, দীর্ঘ ও রক্তাক্ত “সিজ অব বুদাপেস্ট” নামে পরিচিত যুদ্ধ শুরু করে।
এই অবরোধ প্রায় পঞ্চাশ দিন স্থায়ী হয়, যেখানে বুদাপেস্টের সাধারণ মানুষ কষ্টের সীমা অতিক্রম করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। খাদ্য, পানি ও চিকিৎসা সামগ্রীর অভাবের মধ্যে, স্বাধীনতার স্বপ্ন তাদের মনোভাবকে দৃঢ় রাখে। অবশেষে, ১৯৪৫ সালের শুরুর দিকে নাজি বাহিনী শহর ত্যাগ করে, তবে হাঙ্গেরি তৎক্ষণাৎ সোভিয়েত নিয়ন্ত্রণে আসে।
যুদ্ধের পর, হাঙ্গেরি সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাবাধীন হয়ে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রণের মুখোমুখি হয়। যদিও স্বাধীনতা অর্জিত হয়নি, তবু জনগণের মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা কখনো নিভে যায়নি। এই আকাঙ্ক্ষা ১৯৫৬ সালে হাঙ্গেরীয় বিপ্লবে প্রকাশ পায়, যেখানে নাগরিক ও সামরিক বাহিনীর অংশগ্রহণে একটি বড় বিদ্রোহের সূচনা হয়।
বিপ্লবের সময়, বুদাপেস্টের রাস্তায় গণহত্যা, গুলিবিদ্ধ ও দমনের দৃশ্য দেখা যায়, তবে তা আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রে আসে। যদিও সোভিয়েত বাহিনী দ্রুত হস্তক্ষেপ করে, বিদ্রোহকে দমন করে, হাঙ্গেরি জনগণের স্বাধীনতার চেতনা তবু অটুট থাকে। এই ঘটনাটি শীতল যুদ্ধের সময় ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামোর পুনর্গঠনে প্রভাব ফেলেছে।
১৯৮৯ সালে সোভিয়েতের পতন এবং হাঙ্গেরির শান্তিপূর্ণ কমিউনিজম ত্যাগের প্রক্রিয়া শেষমেশ একটি গণতান্ত্রিক রূপান্তরকে সূচনা করে। দেশটি দ্রুত ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোতে যোগ দেয়, যা তার আন্তর্জাতিক অবস্থানকে দৃঢ় করে এবং নিরাপত্তা গ্যারান্টি প্রদান করে। এই পরিবর্তন হাঙ্গেরির দীর্ঘমেয়াদী স্বাধীনতা সংগ্রামের ফলাফল হিসেবে বিবেচিত হয়।
বুদাপেস্টের ড্যানিউব নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা “লিবার্টি স্ট্যাচু” (স্বাধীনতার মূর্তি) আজও সেই সময়ের স্মারক হিসেবে কাজ করে। মূর্তিটি ১৯৪৭ সালে নির্মিত হয়, তবে এর অর্থ ও প্রতীকী মূল্য ১৯৪৪ সালের মুক্তি ও পরবর্তী স্বাধীনতার সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটকরা এই স্মৃতিস্তম্ভকে দেখার জন্য আসে, যা হাঙ্গেরির ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিককে তুলে ধরে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, হাঙ্গেরির স্বাধীনতা সংগ্রাম ইউরোপের সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামোর গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে, ১৯৫৬ সালের বিপ্লব ও ১৯৮৯ সালের শান্তিপূর্ণ রূপান্তর ইউরোপীয় নিরাপত্তা নীতি ও মানবাধিকার সংরক্ষণে প্রভাব ফেলেছে। হাঙ্গেরি এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সক্রিয় সদস্য হিসেবে, তার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে অন্যান্য দেশকে সমর্থন প্রদান করে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সঙ্গে হাঙ্গেরির ইতিহাসে কিছু সাদৃশ্য রয়েছে; উভয় দেশই বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদী সংগ্রাম করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। তবে হাঙ্গেরির ক্ষেত্রে স্বাধীনতা একাধিক পর্যায়ে অর্জিত হয়েছে—প্রথমে নাজি শাসন থেকে, পরে সোভিয়েত শাসন থেকে, এবং শেষমেশ কমিউনিজমের অবসান থেকে। এই ধারাবাহিকতা দেশের জাতীয় চেতনা ও আন্তর্জাতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে।
আজকের ২২ ডিসেম্বর, হাঙ্গেরির নাগরিকরা স্মরণীয় অনুষ্ঠান ও সমাবেশের মাধ্যমে সেই বীরদের সম্মান জানায়, যারা স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়েছেন। সরকার ও সিভিল সোসাইটি সংস্থা মিলিত হয়ে ঐতিহাসিক স্থানগুলোতে আলোকসজ্জা, সঙ্গীত ও সাংস্কৃতিক প্রোগ্রাম আয়োজন করে, যা জাতীয় ঐক্য ও গর্বের প্রতীক হিসেবে কাজ করে।
একজন ইউরোপীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, “হাঙ্গেরির স্বাধীনতা সংগ্রাম ইউরোপের সাম্প্রদায়িক নিরাপত্তা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এবং আজকের আন্তর্জাতিক নীতিতে তার প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়।” এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, হাঙ্গেরির ইতিহাস কেবল জাতীয় নয়, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও গণতন্ত্রের বিকাশে অবদান রেখেছে।
সারসংক্ষেপে, হাঙ্গেরির স্বাধীনতার পথ বহুবার বাধা পেয়েও কখনো শেষ হয়নি। ১৯৪৪, ১৯৫৬ ও ১৯৮৯ সালের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো দেশকে আজকের গণতান্ত্রিক ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অবস্থানে নিয়ে এসেছে। ২২ ডিসেম্বরের এই স্মরণীয় দিনটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে স্বাধীনতার মূল্য ও সংগ্রামের গুরুত্ব পুনরায় উপলব্ধি করিয়ে দেয়, যা কোনো উপহার নয়, অর্জনের ফল।



