ইউক্রেনের যুদ্ধের বর্তমান পর্যায়ে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক অবস্থান তীব্র বিরোধে পরিণত হয়েছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন সম্প্রতি রাশিয়া ইউরোপের জন্য কোনো হুমকি নয় বলে পুনরায় জোর দিয়েছেন, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার শান্তি আলোচক দল রাশিয়ার যুদ্ধবিরতির ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।
পুতিনের এই মন্তব্য তার পূর্বের রাশিয়ার নিরাপত্তা হুমকি সম্পর্কে করা বক্তব্যের সঙ্গে সরাসরি বিরোধপূর্ণ। তিনি রাশিয়ার সামরিক কার্যক্রমকে ইউরোপীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে না দেখার কথা উল্লেখ করে, রাশিয়ার কৌশলগত লক্ষ্যকে পুনঃনির্ধারণের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন শান্তি প্রস্তাবের মূল দিক হল রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটানো। ট্রাম্পের দল ইউক্রেনকে অনুরোধ করেছে যে তারা দোনেৎস্কের অবশিষ্ট অংশ থেকে সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার করুক, যা প্রস্তাবিত শান্তি চুক্তির একটি শর্ত। তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এবং দেশের অধিকাংশ নাগরিক এই শর্তকে অগ্রাহ্য করেছে।
মার্কিন কংগ্রেসের হাউস ইন্টেলিজেন্স কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্য মাইক কুইগলি উল্লেখ করেছেন যে গোয়েন্দা তথ্য ধারাবাহিকভাবে পুতিনের আরও আক্রমণাত্মক লক্ষ্যকে নির্দেশ করে। ইউরোপীয় দেশগুলো এই বিশ্লেষণকে স্বীকার করে, এবং পোল্যান্ড বিশেষভাবে রাশিয়ার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে নিশ্চিত বোধ করে।
বাল্টিক দেশগুলোও রাশিয়ার সম্ভাব্য লক্ষ্যকে নিজেদের দিকে ঘুরিয়ে দেখছে। এ দেশগুলো রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতি বাড়ার ফলে নিরাপত্তা হুমকি বৃদ্ধি পাবে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বর্তমানে রাশিয়া ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর মধ্যে ডনবাসের লুহানস্ক ও দোনেৎস্কের বড় অংশ, জাপোরিঝিয়া ও খেরসনের কিছু এলাকা, এবং ২০১৪ সালে দখল করা ক্রিমিয়া উপদ্বীপ অন্তর্ভুক্ত। এই অঞ্চলগুলো রাশিয়ার সামরিক কার্যক্রমের মূল কেন্দ্র হিসেবে রয়ে গেছে।
পুতিন এই চারটি প্রদেশ এবং ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দাবি করেছেন। তিনি এই দাবি আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে বিতর্কিত হলেও, রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বর্ণনায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ট্রাম্পের দল ইউক্রেনকে দোনেৎস্কের অবশিষ্ট অংশ থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে চাপ দিচ্ছে, যা শান্তি চুক্তির একটি মূল শর্ত। তবে জেলেনস্কি এবং ইউক্রেনের অধিকাংশ জনগণ এই প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করেছে, কারণ তারা বিশ্বাস করে যে এটি দেশের সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ণ করবে।
হোয়াইট হাউসের একটি কর্মকর্তা জানান যে ট্রাম্পের দল শান্তি চুক্তির দিকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং বর্তমান সময়ে চুক্তি পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে নিকটবর্তী। এই মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি প্রচেষ্টার ইতিবাচক দিককে তুলে ধরেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলি গ্যাবার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উল্লেখ করেন যে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা কংগ্রেসকে জানিয়েছেন রাশিয়া ইউরোপের সঙ্গে বৃহৎ পরিসরের যুদ্ধ এড়াতে চায়। ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক পারফরম্যান্স দেখিয়ে তিনি যুক্তি দেন যে রাশিয়া পুরো ইউক্রেন, তদুপরি ইউরোপ দখল করার সামর্থ্য রাখে না।
তবু গোয়েন্দা মহলের কিছু বিশ্লেষক রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা সীমিত হলেও পুতিনের কৌশলগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা অটুট রয়েছে বলে মনে করেন। তারা রাশিয়ার দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যকে ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোর পুনর্গঠন হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মঞ্চে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর শীর্ষ সম্মেলন এবং যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া-ইউক্রেনের ত্রিপক্ষীয় আলোচনার সময়সূচি উল্লেখযোগ্য। এই আলোচনাগুলোতে যুদ্ধবিরতির শর্ত, ভূখণ্ডগত সমন্বয় এবং নিরাপত্তা গ্যারান্টি নিয়ে আলোচনা হবে, যা অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামো নির্ধারণে মূল ভূমিকা রাখবে।



