ময়মনসিংহের ভলুকা উপজেলায় ১৮ ডিসেম্বর গার্মেন্ট কর্মী দীপু চন্দ্র দাসের হিংসাত্মক মৃত্যু এবং লক্ষ্মীপুর সদর জেলায় ১৯ ডিসেম্বর এক সাত বছর বয়সী মেয়ে জ্বালিয়ে মারা যাওয়া দুটি ঘটনা দেশের আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার রক্ষার অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
দীপু চন্দ্র দাস, পায়োনিয়ার্স নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেডের কর্মচারী, স্থানীয় বাসিন্দাদের দ্বারা ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে গোষ্ঠী গঠনের পর হিংসাত্মকভাবে হানা হয়। মিডিয়া সূত্র অনুযায়ী, তাকে গুলি না করে গাঁট গাঁট করে মারধর করা হয় এবং পরে তার দেহকে গাছের ডাল থেকে ঝুলিয়ে ধাকায়-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভাজক অংশে অগ্নিকাণ্ডে পুড়িয়ে ফেলা হয়।
লক্ষ্মীপুরে, বিএনপি নেতা বেলাল হোসেনের বাড়ি রাতে অজানা আক্রমণকারীরা লক করে পেট্রোল ঢেলে জ্বালিয়ে দেয়। বাড়ির ভিতরে থাকা সাত বছর বয়সী মেয়ে পুড়িয়ে মারা যায়। ঘটনাস্থলে উদ্ধারকর্মীরা মৃতদেহের অবশিষ্টাংশ সংগ্রহ করে স্থানীয় হাসপাতাল ও ফরেনসিক ল্যাবের কাছে পাঠায়।
অধিকাংশ মানবাধিকার সংস্থা ও আইন বিশেষজ্ঞরা এই দুই ঘটনার মধ্যে সমান্তরাল দিক দেখিয়ে দেশের মৌলিক অধিকার রক্ষার ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে, উভয় ঘটনাই সংবিধানের জীবনের অধিকার ও আইনের সুরক্ষার অধিকার লঙ্ঘনের স্পষ্ট উদাহরণ।
আইন ও সলিশ কেন্দ্র (ASK) এই দুই ঘটনার পর একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করে, যেখানে বলা হয়েছে যে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে স্বেচ্ছায় আইন প্রয়োগের অধিকার নেই এবং ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগকে কেবল আদালতের মাধ্যমে সমাধান করা উচিত। এছাড়া, শিশুর মৃত্যুকে শিশু অধিকার ও মৌলিক মানবিক নীতির লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে, রাজনৈতিক সহিংসতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা তুলে ধরা হয়েছে।
ASK আরও জোর দিয়ে বলেছে যে এই ধরনের হিংসা আর “একক ঘটনা” হিসেবে গণ্য করা যায় না। ধারাবাহিকভাবে ঘটমান এই রকম অপরাধ সমাজে দায়িত্বহীনতা ও শাস্তি না পায় এমন সংস্কৃতি গড়ে তুলছে, যা আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটাচ্ছে। সংস্থাটি সরাসরি অপরাধী, পরিকল্পনাকারী ও সহায়তাকারী সকলকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে এবং স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, ময়মনসিংহে পুলিশের দ্রুত পদক্ষেপে মামলাটি রেজিস্টার করা হয়েছে এবং তদন্তের জন্য বিশেষ টাস্ক ফোর্স গঠন করা হয়েছে। একই সময়ে, লক্ষ্মীপুরে স্থানীয় পুলিশ দল ঘটনাস্থল থেকে প্রমাণ সংগ্রহ করে অপরাধীদের সনাক্তকরণের জন্য ফোরেনসিক বিশ্লেষণ চালু করেছে। উভয় ঘটনার জন্য আইনি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তদন্তের অগ্রগতি জানার জন্য তথ্য চাওয়া হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দায়িত্ব স্পষ্ট। বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন যে, ধর্মীয় সংবেদনশীলতা ও রাজনৈতিক বিরোধের ক্ষেত্রে আইনগত প্রক্রিয়ার সঠিক ব্যবহার না করলে সমাজে অস্থিরতা বাড়বে এবং অনধিকারী হিংসা বাড়তে থাকবে।
এই দুই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে, মানবাধিকার পর্যবেক্ষক গোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক সংস্থা দেশীয় নিরাপত্তা নীতি পুনর্বিবেচনা ও মানবাধিকার রক্ষার জন্য কঠোর পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে। তারা দাবি করে যে, শিকারের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও মানসিক সহায়তা প্রদান করা উচিত এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধে শিক্ষা, সচেতনতা ও আইনি সংস্কার প্রয়োজন।
সামগ্রিকভাবে, ময়মনসিংহ ও লক্ষ্মীপুরে ঘটিত এই দু’টি হিংসাত্মক ঘটনা দেশের আইনশৃঙ্খলা, মানবাধিকার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা উন্মোচন করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, অপরাধীদের কঠোর শাস্তি এবং ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি রোধে কাঠামোগত সংস্কারই দেশের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষার মূল চাবিকাঠি হবে।



