রবিবার ধানমন্ডি মাইডাস সেন্টারে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আয়োজিত ‘ইলেকশন রিপোর্টিং ও সাংবাদিক নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ’ কর্মশালায় সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান আইন‑শৃঙ্খলা বাহিনীর স্বতন্ত্রভাবে কাজ করার সক্ষমতা এখনও গড়ে ওঠেনি বলে মন্তব্য করেন। তিনি উল্লেখ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে পুলিশসহ অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার নৈতিক ও পেশাগত মানদণ্ডে যথেষ্ট উন্নতি দেখা যায়নি, ফলে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের প্রত্যাশা করা কঠিন।
কর্মশালার শিরোনাম ‘ট্রেনিং অন ইলেকশন রিপোর্টিং অ্যান্ড সেফটি অফ দা জার্নালিস্ট’ ছিল এবং এতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিআইজি তাপাস নাসরিন, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলীসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
ইফতেখারুজ্জামান জানান, নির্বাচনের সময় সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও কাজের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করার জন্য যে জটিল বিষয়গুলো রয়েছে, সেগুলো নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যথেষ্ট সমন্বয় করা যায়নি এবং এই বিষয়গুলো পুনরায় আলোচনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ভোটকেন্দ্রের উচ্চতর পদস্থ কর্মকর্তারা, যাদের হাতে ফলাফলের ওপর প্রভাবের সম্ভাবনা থাকে, তারা প্রায়শই সাংবাদিকদের কাজের পথে বাধা সৃষ্টি করে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি সাম্প্রতিক সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে এবং এই পরিবর্তনের ফলে স্বতন্ত্র পর্যবেক্ষণ ও সমালোচনার সুযোগ কমে গেছে; এই প্রবণতা ৫ আগস্টের পর থেকে স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যদিও সামগ্রিকভাবে নির্বাচন সংক্রান্ত প্রক্রিয়াগুলো কিছুটা মসৃণ হয়েছে, তবু পুলিশ বাহিনী এখনো স্বতন্ত্রভাবে কাজ করার পর্যায়ে পৌঁছায়নি এবং দলীয় প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা দরকার।
ইফতেখারুজ্জামান আশা প্রকাশ করেন, আইন‑শৃঙ্খলা সংস্থাগুলো নির্বাচনকালীন সময়ে তাদের পেশাগত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করবে এবং কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মুখে না পড়বে। তার এই মন্তব্য বর্তমান রাজনৈতিক আলোচনার মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব পায়, যেখানে বিরোধী দলগুলো পুলিশকে পার্টি‑নির্ভর বলে সমালোচনা করে এবং সরকার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য সংস্কার দাবি করে।
টিআইবি দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও সাংবাদিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। এই কর্মশালায় সাংবাদিকদের ঝুঁকি মূল্যায়ন, আইনি সুরক্ষা এবং নিরাপদ রিপোর্টিং পদ্ধতি শেখানো হয়েছে, পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর জন্য প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা হয়েছে।
ইফতেখারুজ্জামান উল্লেখ করেন, নির্বাচন কমিশনের উচিত ভোটকেন্দ্রের কর্মকর্তাদের জন্য স্পষ্ট নির্দেশিকা তৈরি করা, যাতে মিডিয়ার প্রবেশাধিকার ও কাজের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়। তিনি বলেন, এ ধরনের নীতিমালা না থাকলে সাংবাদিকরা ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আইন‑শৃঙ্খলা বাহিনীর স্বতন্ত্রতা ও পেশাদারিত্বের ঘাটতি নিয়ে তার মন্তব্য ভবিষ্যতে সংসদে আইন প্রণয়ন ও সংশোধনী নিয়ে আলোচনার দিক নির্ধারণ করতে পারে। বিশেষ করে নির্বাচনের পূর্বে পুলিশ সংস্কার, নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মিডিয়া স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন হবে।
এই কর্মশালার মাধ্যমে টিআইবি নির্বাচনী সময়ে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের আইন‑শৃঙ্খলা সংস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর লক্ষ্য রাখে। ইফতেখারুজ্জামানের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, স্বতন্ত্র ও পেশাদার আইন‑শৃঙ্খলা বাহিনী গড়ে তোলাই দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সুষ্ঠু পরিচালনার মূল চাবিকাঠি।



