লন্ডনের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত আলতাব আলি পার্কে রবিবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশি সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও ব্রিটিশ বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের সদস্যরা একত্রিত হয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় দুই সংবাদপত্র—দৈনিক স্টার ও প্রথম আলোর ওপর আক্রমণকে নিন্দা জানালেন। প্রতিবাদটি বাংলা ভাষায় কাজ করা লন্ডন ভিত্তিক সাংবাদিকদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় এবং মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের ওপর ভয় দেখানো, ধ্বংস করা ও সাংবাদিকদের জীবনের হুমকি দেওয়া ঘটনাগুলোর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ প্রকাশ করে।
প্রদর্শনায় অংশগ্রহণকারীরা আক্রমণের ধরণ—ভ্যাণ্ডালিজম, অগ্নিকাণ্ড, লুটপাট এবং সাংবাদিকদের ওপর সরাসরি আক্রমণের প্রচেষ্টা—কে অস্বীকারযোগ্য এবং বাংলাদেশের মিডিয়া ইতিহাসের একটি “কালো দিন” হিসেবে বর্ণনা করেন। অংশগ্রহণকারীরা জোর দিয়ে বলেন যে দৈনিক স্টার ও প্রথম আলো স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মডেল হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছে, যা তাদেরকে হুমকি ও সহিংসতার লক্ষ্যবস্তু করে তুলেছে।
প্রদর্শনের মূল দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে আক্রমণের দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তের আহ্বান, দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অংশগ্রহণকারীরা সরকারকে মিডিয়া স্বাধীনতা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আহ্বান জানায়।
একজন প্রাক্তন BBC বাংলা সাংবাদিক বলেন, যদিও বাংলাদেশে পূর্বে মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে, তবে সাম্প্রতিক সহিংসতা একটি নতুন মাত্রা গ্রহণ করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, “মতভেদের স্থান গণতান্ত্রিক সমাজে স্বাভাবিক, তবে সংগঠিত সহিংসতা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।” এই বক্তব্যটি মিডিয়া স্বাধীনতার প্রতি সম্মান ও নিরাপত্তার গুরুত্বকে তুলে ধরে।
কমনওয়েলথ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি আরও বলেন, আক্রমণগুলো কেবল প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি নয়, সরাসরি সাংবাদিকদের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলেছে। তিনি উল্লেখ করেন, “এটি শাসনের গুরুতর ব্যর্থতা, যেখানে নাগরিক ও সাংবাদিকের নিরাপত্তা রক্ষা করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।” এই মন্তব্যটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে মিডিয়া সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদকও জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশি প্রবাসীরা এই ধরনের হুমকির বিরুদ্ধে একসাথে দাঁড়াবে। তিনি উল্লেখ করেন, “মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বিরোধী কোনো শক্তি যদি বাংলাদেশে শক্তি অর্জন করতে চায়, তবে আমরা একত্রে তা রোধ করব।” এই বক্তব্যটি দেশীয় ও প্রবাসী উভয় স্তরে মিডিয়া স্বাধীনতার প্রতি দৃঢ় অবস্থানকে প্রকাশ করে।
প্রদর্শনের মডারেটর, একজন সম্প্রচার সাংবাদিক ও লেখক, সমাবেশে উপস্থিত সকলকে একত্রে কাজ করার আহ্বান জানান এবং মিডিয়া সংস্থাগুলোর স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা বজায় রাখার গুরুত্ব তুলে ধরেন। সমাবেশের শেষে অংশগ্রহণকারীরা একত্রে শপথ নেন যে, তারা ভবিষ্যতে কোনো ধরনের হিংসা বা ভয় দেখানোর প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে প্রতিবাদ করবে।
এই প্রতিবাদটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মিডিয়া নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার আলোকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের মানবাধিকার সংস্থা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মিডিয়া পর্যবেক্ষক সংস্থা ইতিমধ্যে এই ঘটনার ওপর মন্তব্যের ইঙ্গিত দিয়েছেন, যা ভবিষ্যতে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও সহযোগিতার সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।
বাংলাদেশের সরকারও এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে সমর্থন ও সমঝোতা চেয়ে রয়েছে, যাতে আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া যায় এবং মিডিয়া সংস্থাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। এদিকে, দেশীয় পর্যায়ে সাংবাদিক সংস্থাগুলো ইতিমধ্যে নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্বিবেচনা এবং আইনগত কাঠামো শক্তিশালী করার জন্য আলোচনা শুরু করেছে।
সামগ্রিকভাবে, লন্ডনের এই প্রতিবাদটি বাংলাদেশের মিডিয়া সংস্থাগুলোর ওপর আক্রমণকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার পাশাপাশি, প্রবাসী সম্প্রদায়ের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান ও মিডিয়া স্বাধীনতার প্রতি অটুট সমর্থনকে প্রকাশ করেছে। ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা রোধে সরকার, মিডিয়া সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সংস্থার সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।



