লখনউ, উত্তরপ্রদেশের একটি শহর, সম্প্রতি ইউনেস্কোর পক্ষ থেকে ‘সৃজনশীল ভোজনবিলাসের শহর’ শিরোনাম পেয়েছে। এই স্বীকৃতি শহরকে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে যুক্ত করেছে, যেখানে সৃজনশীলতা নগর উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে গণ্য হয়। ইউনেস্কোর দক্ষিণ এশিয়া কার্যালয়ের পরিচালক টিম কার্টিস উল্লেখ করেন, লখনউয়ের সমৃদ্ধ রান্না ঐতিহ্যই এই সম্মানের মূল ভিত্তি।
স্বীকৃতির মাধ্যমে লখনউ ৪০৮টি শহরের নেটওয়ার্কে যোগ দিল, যা ১০০টির বেশি দেশের প্রতিনিধিত্ব করে। এই সমষ্টিতে খাবার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও উদ্ভাবনকে নগর নকশার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ফলে লখনউ এখন বিশ্বের অন্যতম পরিচিত ‘খাবারের শহর’ হিসেবে বিবেচিত।
২০২৪ সালের শেষের দিকে ইউনেস্কোর মূল্যায়ন দল লখনউ পরিদর্শন করে, যেখানে রেস্টুরেন্ট, বাজার ও ঐতিহাসিক খাবার কেন্দ্রগুলো পর্যালোচনা করা হয়। কাবাব, বিরিয়ানি ও মিষ্টান্নের বৈচিত্র্য স্পষ্টভাবে দেখা যায়, যা শহরকে উত্তর ভারতের খাবারপ্রেমীদের জন্য এক স্বর্গরাজ্য করে তুলেছে। এই খাবারগুলোই লখনউকে আন্তর্জাতিক মানচিত্রে আলাদা করে তুলেছে।
ইউনেস্কোর তালিকায় লখনউকে যুক্ত করা হয়েছে ৭০টি বিশ্ববিখ্যাত খাবার শহরের মধ্যে, যেখানে ভারতীয় শহর হিসেবে এটি দ্বিতীয় স্থান দখল করেছে। পূর্বে ২০১৯ সালে হায়দ্রাবাদ এই স্বীকৃতি পেয়েছিল, আর এখন লখনউ তার পরের পদে উঠে এসেছে।
শহরের বাসিন্দা ও রন্ধনশিল্পীরা এই ঘোষণাকে অপ্রত্যাশিত নয় বলে জানান। বহু বছর ধরে লখনউয়ের খাবার সংস্কৃতি শহরের পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রান্না, স্বাদ ও উপস্থাপনা নিয়ে আলোচনা ঘরে ঘরে চলতে থাকে।
স্থানীয় রন্ধনশিল্পী রানভীর ব্রার মন্তব্যে তিনি বলেন, স্বীকৃতি দেরিতে হলেও সঠিক সময়ে এসেছে এবং আগে এ ধরনের স্বীকৃতি পাওয়া উচিত ছিল। তিনি যোগ করেন, লখনউয়ের খাবারকে শুধু স্বাদ নয়, সময় ও যত্নের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয়।
সানাতকাড়া ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা মাধবী কুক্রেজা ‘কিচেনস অফ লখনউ’ প্রকল্পের মাধ্যমে শহরের খাবার ঐতিহ্য সংরক্ষণে কাজ করছেন। তিনি উল্লেখ করেন, লখনউয়ের রান্না শতাব্দীর পুরনো ঐতিহ্য, যা নবাবদের শাসনকালে পারস্য ও স্থানীয় ভারতীয় স্বাদের মেলবন্ধনে গড়ে উঠেছিল। এই মিশ্রণই আজকের আওয়ধি খাবারের ভিত্তি গঠন করে, যার মধ্যে কাবাবের বিশেষ স্থান রয়েছে।
কাবাবের উৎপত্তি সম্পর্কে বলা হয়, এক নবাবের দাঁত হারানোর সমস্যার সমাধানে মাটন গালোটি কাবাব তৈরি করা হয়েছিল। মাংসকে পেঁপে, জাফরান ও মশলায় মাখিয়ে এতটাই নরম করা হয়েছিল যে চিবানোর প্রয়োজনই না থাকত। একই সময়ে ‘দম পুখত’ পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়, যেখানে খাবার কম আঁচে, বন্ধ পাত্রে ধীরে ধীরে রান্না করা হয়, যা স্বাদকে গভীর করে এবং মশলার সুবাসকে ধরে রাখে।
ইউনেস্কোর স্বীকৃতি লখনউয়ের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও পর্যটন বৃদ্ধির নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। শহরের রন্ধনশিল্পী ও উদ্যোক্তারা এখন বিদেশি পর্যটকদের জন্য বিশেষ ট্যুর ও কর্মশালা পরিকল্পনা করছেন, যাতে তারা লখনউয়ের স্বাদ উপভোগ করতে পারে। শেষমেশ, লখনউয়ের খাবার সংস্কৃতি শুধু স্বাদই নয়, বরং শহরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ, যা বিশ্ব মঞ্চে আরও সৃজনশীল উদ্যোগের জন্য প্রেরণা দেবে।



