বাংলাদেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে স্যানিটেশন অবস্থা নিয়ে সম্প্রতি একটি ব্যাপক জরিপের ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৪ সালের শেষের দিকে, রাজধানীর আগারগাঁওয়ের পরিসংখ্যান ভবনের অডিটোরিয়ামে এই তথ্য উপস্থাপন করা হয়। জরিপে দেখা যায়, দেশের মাত্র ২৮.৬ শতাংশ স্কুলে প্রতি পঞ্চাশ শিক্ষার্থীর জন্য একটি উন্নত টয়লেটের ব্যবস্থা রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক ন্যূনতম মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই মানদণ্ডের নিচে থাকা স্কুলগুলোতে টয়লেটের সংখ্যা ও গুণগত মান দুটোই অপর্যাপ্ত, ফলে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে মাত্র ৩৩.৯ শতাংশই নিরাপদ মানববর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারছে, আর ৪৫.৪ শতাংশই এই ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান পূরণ করে।
পানির সরবরাহের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত। ৯৫.৪ শতাংশ স্কুল এবং ৮৭.৫ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে উন্নত পানির উৎসে প্রবেশের সুবিধা রয়েছে। তবে, এই উৎসগুলো প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণে অবস্থিত হওয়া প্রয়োজন, যা মাত্র ৮৬.১ শতাংশ স্কুল এবং ৭০.৫ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে পূরণ হয়েছে।
অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য পানির সুবিধা আরও সীমিত। শুধুমাত্র ৫৫.৪ শতাংশ স্কুল এবং ৪০.৯ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রই প্রতিবন্ধী ব্যবহারকারীর জন্য উপযুক্ত পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারছে। এই ঘাটতি বিশেষ করে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার গুণগত মানকে প্রভাবিত করে।
বাজেটের দিক থেকে দেখা যায়, টয়লেট ও স্যানিটেশন উন্নয়নের জন্য যথেষ্ট আর্থিক বরাদ্দ নেই। মাত্র ১১.১ শতাংশ স্কুল এবং ৩৪.৯ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে এই খাতে নির্দিষ্ট বাজেট রয়েছে। ফলে, অবকাঠামো উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
টয়লেটের উপস্থিতি যদিও বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে রয়েছে; ৯০.৬ শতাংশ স্কুল এবং ৯৮.৫ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে অন্তত একটি টয়লেট আছে। তবে, এই টয়লেটগুলো প্রায়শই ব্যবহারযোগ্য নয়, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পানির সরবরাহ ও স্যানিটারি সুবিধার অভাব রয়েছে।
হাত ধোয়ার সুবিধা সম্পর্কে জরিপে চমকপ্রদ তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। ৫১.৭ শতাংশ স্কুল মৌলিক হাত ধোয়ার মান পূরণ করতে পারে, কিন্তু স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে এই হার মাত্র ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। হাত ধোয়ার এই ঘাটতি সংক্রমণ রোগের বিস্তার বাড়াতে পারে।
জরিপটি আটটি বিভাগ ও ৬৪টি জেলার সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করেছে। তথ্য সংগ্রহের কাজ ২৬ জুন থেকে ১৭ জুলাই ২০২৪ পর্যন্ত মাঠ পর্যায়ে সম্পন্ন হয়। নমুনা নির্বাচন ও ডেটা বিশ্লেষণে আন্তর্জাতিক পরামর্শদাতা সংস্থা ওয়াটসনের পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে।
ফলাফল উপস্থাপনায় উপস্থিত ছিলেন পরিসংখ্যান ব্যুরোর মহাপরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, সিডি (SID) সচিব আলেয়া আক্তার, অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ সোহেল রানা চৌধুরী, ওআইসি ইউনিসেফ বাংলাদেশ প্রতিনিধি ফারুক আদরিয়ান ডুমন এবং এসডিজি সেল ফোকাল পয়েন্ট মো. আলমগীর হোসেন। তাদের বক্তব্যে স্যানিটেশন উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগ ও শাসন কাঠামো শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা জোর দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনটি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, টয়লেট ও পানির গুণগত মানের উন্নতি না হলে শিক্ষার্থীর স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। স্যানিটেশন অবকাঠামোর ঘাটতি পরিবেশ দূষণ ও রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি করতে পারে।
পাঠকদের জন্য ব্যবহারিক টিপস: স্কুল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের স্যানিটেশন অবস্থা সম্পর্কে জানার জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করুন, এবং যদি সম্ভব হয়, স্বেচ্ছাসেবী গ্রুপের মাধ্যমে টয়লেট পরিষ্কার ও হাত ধোয়ার স্টেশন স্থাপনকে সমর্থন করুন। আপনার ছোট উদ্যোগ ভবিষ্যতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।



