ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রশাসনিক ভবনের সামনে রোববার বিকেলে ছাত্র-শিক্ষক গোষ্ঠী একত্রিত হয়ে ঘেরাও চালায়। ডিএসএল (ডাকসু) নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন হলের বাসিন্দা শিক্ষার্থীরা উপাচার্য ভবনের প্রবেশদ্বার অবরুদ্ধ করে, নাম পরিবর্তন ও শাসনব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। মূল দাবি হল শেখ মুজিবুর রহমান হলের নাম পরিবর্তন করে ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ এবং বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা হলের নাম ‘ফেলানী হল’ করা। পাশাপাশি, জুলাই মাসে গণহত্যা সমর্থনকারী শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপের দাবি তোলা হয়।
প্রতিবাদকারীরা রোববার দুপুরে আড়াইটার দিকে উপাচার্য ভবনের সামনে অবস্থান নেয় এবং বিভিন্ন স্লোগান উচ্চারণ করে। “ফ্যাসিবাদের আস্তানা, ঢাবিতে থাকবে না” ও “মুজিববাদ মুজিববাদ, মুর্দাবাদ মুর্দাবাদ” শ্লোগানগুলো ভিড়ের মধ্যে গুঞ্জরায়। স্লোগানগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন ও শাসনব্যবস্থার প্রতি অসন্তোষের প্রকাশ হিসেবে দেখা যায়।
ঘেরাও কর্মসূচিতে ডিএসএল সমাজসেবা সম্পাদক এ বি জুবায়ের বক্তব্যও শোনা যায়। তিনি উল্লেখ করেন যে ইতিহাসে দেখা যায়, হাসিনার চেয়েও বেশি স্বৈরাচারী ছিলেন মুজিব, এবং মুজিবের কোনো চিহ্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রাখা উচিত নয়। এছাড়া, জুলাই মাসে যারা গণহত্যা সমর্থন করেছেন, তাদেরও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া দরকার বলে তিনি জোর দেন। এই বক্তব্যগুলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদ্যমান বিরোধপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ও রাজনৈতিক উত্তেজনা তুলে ধরে।
প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন হলের বাসিন্দা, যার মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের ছাত্র-ছাত্রী অন্তর্ভুক্ত। তারা একত্রে উপাচার্য ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পুনর্বিবেচনা ও নাম পরিবর্তনের দাবি পুনরায় তুলে ধরে। এই ধরনের সমাবেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সক্রিয়তা ও প্রভাবের সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়।
শেখ মুজিবুর রহমান হলের নাম পরিবর্তনের দাবি মূলত ২০২৩ সালে মুজিবের নামে একটি হলের নামকরণকে বিরোধিতা করে গৃহীত হয়। শিক্ষার্থীরা যুক্তি দেন যে মুজিবের নাম ব্যবহার করে এমন কোনো স্মারক ভবন থাকা উচিত নয়, বিশেষ করে যখন তার শাসনকালে স্বৈরাচারী নীতি প্রয়োগের অভিযোগ রয়েছে। একই সময়ে, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা হলের নাম পরিবর্তনের দাবিও সমানভাবে তীব্র। শিক্ষার্থীরা এই হলের নামকে ‘ফেলানী হল’ করে নতুন নামকরণে সমর্থন জানায়, যা মূল নামের পরিবর্তে একটি নিরপেক্ষ বা অজানা নামের ইঙ্গিত দেয়।
দাবিগুলোকে সমর্থনকারী গোষ্ঠী উল্লেখ করে যে, জুলাই মাসে ঘটে যাওয়া গণহত্যা সমর্থনকারী শিক্ষক ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এই গণহত্যা, যা দেশের বিভিন্ন অংশে সংঘটিত হয়, তাতে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং তা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা দাবি করে যে, এমন সমর্থনকারী ব্যক্তিদের উপর প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নিলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে না।
উপাচার্য ভবনের সামনে ঘেরাও চলাকালীন নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি সীমিত ছিল, ফলে কোনো সংঘর্ষের ঘটনা রেকর্ড হয়নি। তবে, শিক্ষার্থীদের সমাবেশে নিরাপত্তা রক্ষার জন্য কিছু প্রাথমিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এই ধরনের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা এবং শিক্ষার্থীদের মত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা উল্লেখ করে যে, নাম পরিবর্তন ও শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে আরও স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার প্রয়োজন। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে নামকরণ প্রক্রিয়ার পুনর্বিবেচনা ও সংশোধনের আহ্বান জানায়। এছাড়া, শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে ভবিষ্যতে এমন কোনো নামকরণে সতর্কতা অবলম্বন করতে অনুরোধ করে।
ডিএসএল নেতারা উল্লেখ করেন যে, নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে পুনর্গঠন করা সম্ভব। তারা যুক্তি দেন যে, নামকরণে রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে, শিক্ষার পরিবেশকে আরও স্বতন্ত্র ও নিরপেক্ষ করা উচিত। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে নামকরণে জনমত ও ঐতিহাসিক প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি করে।
প্রতিবাদে ব্যবহৃত স্লোগানগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক পরিবেশের প্রতিফলন। “ফ্যাসিবাদের আস্তানা, ঢাবিতে থাকবে না” স্লোগানটি স্বৈরাচারী শাসনের বিরোধিতা প্রকাশ করে, আর “মুজিববাদ মুজিববাদ, মুর্দাবাদ মুর্দাবাদ” স্লোগানটি রাজনৈতিক বিরোধের প্রতীক হিসেবে দেখা যায়। এই স্লোগানগুলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদ্যমান তীব্র মতবিরোধের সূচক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন এখনও এই দাবিগুলোর উপর কোনো স্পষ্ট মন্তব্য করেনি। তবে, পূর্বে নাম পরিবর্তনের অনুরোধের প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় কিছুটা ধীরগতি দেখিয়েছে। শিক্ষার্থীরা আশা করে যে, এই ঘেরাও এবং দাবিগুলো প্রশাসনের দৃষ্টিতে দ্রুত বিবেচনা পাবে এবং উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবহারিক পরামর্শ: যদি আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণ বা নীতি পরিবর্তন নিয়ে উদ্বিগ্ন হন, তবে আপনার মতামত লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট বিভাগে জমা দিন এবং ছাত্র সংসদের মাধ্যমে আপনার দাবিগুলোকে সংগঠিত করুন। আপনার মত প্রকাশের অধিকার রক্ষা করতে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও আইনগত পদ্ধতি ব্যবহার করা গুরুত্বপূর্ণ।
আপনার মতামত কী? আপনি কি মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণে রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে শিক্ষার পরিবেশকে স্বতন্ত্র করা উচিত, নাকি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের স্মৃতি বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ? আপনার মন্তব্য শেয়ার করুন এবং এই আলোচনায় অংশ নিন।



