রাশিয়ার সাম্প্রতিক ড্রোন আক্রমণ তীব্রতর হওয়ায় ইউক্রেনের খারকিভ শহরের প্রধান সড়কগুলোতে জাল স্থাপন করা হয়েছে। এই পদক্ষেপটি রাশিয়ান ড্রোনের ধারাবাহিক হুমকি মোকাবেলায় নেওয়া হয়েছে এবং শহরের নাগরিক ও সামরিক অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
রাশিয়ান বাহিনী সাম্প্রতিক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শত শত ড্রোন চালু করেছে। এই ড্রোনগুলো উচ্চ গতিতে উড়ে লক্ষ্যবস্তু সনাক্ত করে দ্রুত আক্রমণ চালায়, ফলে ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা বাহিনীর মতে, ড্রোনের সংখ্যা এবং আক্রমণের তীব্রতা পূর্বের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
খারকিভের সব প্রধান রাস্তা, গ্রামীণ পথ, সামরিক ঘাঁটি এবং হাসপাতালের প্রবেশদ্বার জালের মাধ্যমে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। জালগুলো কেবল শহরের কেন্দ্রীয় সড়কেই নয়, পার্শ্ববর্তী গ্রাম ও সরবরাহ রুটেও বিস্তৃত, যাতে ড্রোনের পর্যবেক্ষণ ও আক্রমণ সীমিত করা যায়।
এই জালের মূল উদ্দেশ্য ড্রোনকে ধ্বংস করা নয়, বরং তার গতি ও সুনির্দিষ্টতা কমিয়ে আনা। জালের মাধ্যমে ড্রোনের পাখা ও সেন্সর বাধাগ্রস্ত হয়, ফলে লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণে বিলম্ব ঘটে এবং আক্রমণের সাফল্য কমে যায়।
পূর্বে ড্রোনের সিগন্যাল বাধা দেওয়ার জন্য জ্যামার ব্যবহার করা হতো, তবে রাশিয়ার নতুন ফাইবার-অপটিক ভিত্তিক ড্রোনগুলোতে এই প্রযুক্তি আর কার্যকর নয়। তাই ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা বাহিনীর জন্য জাল ব্যবহারের বিকল্পটি একমাত্র কার্যকর উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাশিয়ান ড্রোনগুলো কেবল আক্রমণের জন্য নয়, গোয়েন্দা সংগ্রহের জন্যও ব্যবহৃত হয়। তারা শহরের অবকাঠামো, সামরিক ঘাঁটি এবং গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাগুলোকে রিয়েল-টাইমে স্ক্যান করে, সন্দেহজনক নড়াচড়া সনাক্ত হলে দ্রুত আক্রমণ চালায়। এই প্রক্রিয়া ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
জালের মাধ্যমে ইউক্রেনের সামরিক ও বেসামরিক সেবা রক্ষা করা হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ রুট, রসদ পরিবহনের পথ এবং অ্যাম্বুলেন্সের থামার জায়গা জালের নিচে রাখা হয়েছে, যাতে ড্রোনের আক্রমণ থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত হয়।
নেটগুলো গাছের ডাল, ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনের কাঠামো এবং সহজে পাওয়া উপকরণ দিয়ে তৈরি। যদিও এই জালগুলো সস্তা এবং তাত্ক্ষণিক সুরক্ষা দেয়, তবে সেগুলোকে চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে দেখা হয় না। ইউক্রেনের কমান্ডাররা স্বীকার করেছেন, জালগুলো ড্রোনের ক্ষতি কমাতে সহায়ক, তবে দীর্ঘমেয়াদী সমাধান নয়।
কমান্ডাররা উল্লেখ করেছেন, আকাশের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ না পেয়ে তারা ড্রোনের গতি কমাতে পারছে। এই লক্ষ্যে বিভিন্ন নকশার জাল পরীক্ষা করা হচ্ছে; কিছুতে মাছ ধরার জাল, অন্যগুলোতে মোটা রশির গ্রিড এবং মিশ্র উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে। এই অস্থায়ী বাধা ব্যবস্থা ড্রোনের কার্যকারিতা হ্রাসে সহায়তা করছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ন্যাটো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই পদক্ষেপকে ইউক্রেনের নাগরিক রক্ষার একটি বাস্তবিক উদ্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি কূটনৈতিক সূত্র উল্লেখ করেছে, “ড্রোন হুমকির মুখে ইউক্রেনের সৃজনশীল প্রতিরক্ষা কৌশল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন পাওয়ার যোগ্য।”
ইউক্রেনের এই জাল ব্যবহারের পদ্ধতি অন্যান্য সংঘর্ষে দেখা কৌশলের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। গাজা এবং ইয়েমেনে কিছু সময়ে সাময়িক বাধা গঠন করে ড্রোনের আক্রমণ সীমিত করার প্রচেষ্টা করা হয়েছে, তবে খারকিভের ক্ষেত্রে জালের পরিসর ও লক্ষ্যবস্তু বেশি বিস্তৃত।
আসন্ন সপ্তাহে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জালের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করে আরও উন্নত নকশা প্রয়োগের পরিকল্পনা প্রকাশ করবে। একই সঙ্গে, ইউরোপীয় নিরাপত্তা সংস্থা এবং জাতিসংঘের মানবিক সংস্থা এই উদ্যোগের মানবিক প্রভাব পর্যবেক্ষণ করবে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবে।
এই পদক্ষেপের ফলে রাশিয়ান ড্রোনের আক্রমণ ধীর হতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে ড্রোন প্রযুক্তি ও কৌশল পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন এবং কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা কৌশলকে শক্তিশালী করা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশ্লেষকরা মত প্রকাশ করেছেন।



