লন্ডনের কেন্দ্রীয় অংশে শনিবার একাধিক দশজনের সমাবেশে প্যালেস্টাইনি বন্দীদের মুক্তি দাবি করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা ইসরায়েলি কারাগারে ‘প্রশাসনিক আটক’ নামে পরিচিত অনির্দিষ্টকালীন নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, যেখানে কোনো অপরাধের প্রমাণ না থাকলেও ভবিষ্যতে আইন লঙ্ঘনের সম্ভাবনা বলে আটক করা হয়।
সমাবেশে অংশগ্রহণকারীরা লাল রিবন পরিধান করে, যা তারা বিপদ ও জরুরিতার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করে। রিবনের মাধ্যমে তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায়, যাতে প্যালেস্টাইনি বন্দীদের মানবিক অবস্থার প্রতি মনোযোগ বাড়ে।
আয়োজনকারীরা জানিয়েছেন, এই ভিগিলটি একটি বৈশ্বিক প্রচারণার সূচনা হিসেবে কাজ করবে। তারা ইসরায়েলি শাসনের অধীনে দীর্ঘ সময় ধরে আটক থাকা বন্দীদের অধিকার রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন গড়ে তোলার লক্ষ্য রাখে।
বিশেষভাবে ড. হুসাম আবু সাফিয়া, গাজা অঞ্চলের কামাল আদওয়ান হাসপাতালের প্রাক্তন পরিচালক, যাকে ডিসেম্বর ২০২৪-এ ইসরায়েলি সেনাবাহিনী হাসপাতাল থেকে সরিয়ে নেয়া হয়, তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। তার আইনজীবী ও পরিবার সদস্যদের মতে, ড. সাফিয়া ইসরায়েলি কারাগারে শারীরিক নির্যাতন, মানসিক কষ্ট এবং দীর্ঘ সময় একাকী কক্ষের শর্তে রাখা হয়েছে।
প্যালেস্টাইনি ফোরাম ইউকে-র চেয়ার আদনান হমিদান, যিনি সমাবেশের আয়োজকও, উল্লেখ করেন, “তারা তাকে সাদা কোট পরা অবস্থায় ট্যাঙ্কে নিয়ে গিয়েছিল, হাসপাতালের সামনে সবাই দেখেছিল।” তিনি আরও যোগ করেন, কিছু প্যালেস্টাইনি আটক তাদের আইনজীবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারে না এবং আদালতের তারিখও নির্ধারিত হয় না।
প্যালেস্টাইনি মানবাধিকার সংস্থা অ্যাডামিরের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলি কারাগারে বর্তমানে ৯,৩০০ জন প্যালেস্টাইনি রাজনৈতিক বন্দী ও আটক রয়েছে, যার বেশিরভাগই ট্রায়াল বা অভিযোগ ছাড়াই আটক। এই সংখ্যা সামরিক শিবিরে আটকদের অন্তর্ভুক্ত নয়। সংস্থা আরও জানায়, পশ্চিম তীর থেকে অন্তত ৩,৩৫০ জনকে ‘প্রশাসনিক আটক’ হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়েছে।
ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা বি’ত্সেলেমের মতে, এই ধরনের আটক প্রথা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে প্রশ্নবিদ্ধ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি বহন করে। সংস্থার বিশ্লেষক উল্লেখ করেন, “প্রশাসনিক আটক ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানবিক নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এটি দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের সমাধানে বাধা সৃষ্টি করে।”
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কিছু সদস্য দেশ ইতিমধ্যে ইসরায়েলকে ‘প্রশাসনিক আটক’ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের সাম্প্রতিক অধিবেশনে এই বিষয়টি আলোচনার সূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যেখানে কিছু রাষ্ট্র ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে দায়বদ্ধ করার প্রস্তাব রেখেছে।
বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন, লন্ডনের এই ভিগিলের পরবর্তী ধাপ হতে পারে ইউরোপের বড় শহরে সমান ধরনের প্রতিবাদ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার মাধ্যমে আইনি পদক্ষেপের সূচনা। বিশেষত, ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতে ‘প্রশাসনিক আটক’কে অবৈধ ঘোষণা করার মামলা দায়ের করা হতে পারে।
এই সমাবেশের মাধ্যমে প্যালেস্টাইনি সম্প্রদায়ের দাবি স্পষ্ট হয়েছে: ইসরায়েলি শাসনের অধীনে দীর্ঘ সময় ধরে আটক থাকা বন্দীদের অবিলম্বে মুক্তি এবং ‘প্রশাসনিক আটক’ প্রথার সমাপ্তি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন ও কূটনৈতিক চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই বিষয়টি ভবিষ্যতে কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে পারে।
লন্ডনের এই ভিগিলটি প্যালেস্টাইনি মানবাধিকার সংস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সমর্থন ও আইনি পদক্ষেপের ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে।



