থাইল্যান্ড এবং ক্যাম্বোডিয়ার মধ্যে পুনরায় তীব্র সীমান্ত সংঘর্ষে দুই সপ্তাহের মধ্যে অর্ধ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ তাদের বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। ক্যাম্বোডিয়ার অভ্যন্তরীণ মন্ত্রণালয় রবিবার জানিয়েছে, এই সংঘর্ষের ফলে ৫১৮,৬১১ নাগরিক, যার মধ্যে নারী ও শিশুরাও অন্তর্ভুক্ত, নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে ত্যাগ করতে হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, থাইল্যান্ডের এফ-১৬ বিমান দ্বারা চালিত আর্টিলারি শেল, রকেট এবং বায়ু বোমা হামলার ফলে ক্যাম্বোডিয়ার বহু গ্রাম ও বিদ্যালয় ধ্বংস হয়েছে, ফলে মানুষকে শরণস্থলে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। এই শরণার্থীদের অধিকাংশই সীমান্তের নিকটবর্তী গ্রামগুলোতে বসবাস করছিলেন, যেখানে তারা প্রায়ই কৃষিকাজ ও ছোট ব্যবসা চালাতেন।
থাইল্যান্ডের দিক থেকেও একই সময়ে প্রায় ৪ লক্ষেরও বেশি মানুষ স্থানচ্যুত হয়েছে বলে সরকারী সূত্র জানিয়েছে। থাইল্যান্ডের সরকার উল্লেখ করেছে, সীমান্তের উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় জনগণকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে, যাতে তারা আর্টিলারি ও ড্রোন আক্রমণ থেকে রক্ষা পায়।
এই পুনরায় জ্বালানো সংঘর্ষে থাইল্যান্ডে অন্তত ২২ জন এবং ক্যাম্বোডিয়ায় ১৯ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। আহত সংখ্যার সঠিক তথ্য এখনও প্রকাশিত হয়নি, তবে উভয় পক্ষই উল্লেখ করেছে যে বেসামরিক জনগণও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সামরিক দিক থেকে, উভয় দেশই ট্যাংক, ড্রোন এবং আর্টিলারি ব্যবহার করে সীমান্তে আক্রমণ চালিয়েছে। থাইল্যান্ডের এফ-১৬ যুদ্ধবিমান থেকে বোমা নিক্ষেপের খবর পাওয়া গেছে, আর ক্যাম্বোডিয়া নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনীর মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। এই ধরনের আধুনিক অস্ত্রের ব্যবহার সংঘর্ষকে আরও প্রাণঘাতী করে তুলেছে।
সংঘর্ষের মূল কারণ হল ঔপনিবেশিক সময়ে নির্ধারিত ৮০০ কিলোমিটার (৫০০ মাইল) দীর্ঘ সীমান্তের সীমানা নিয়ে বিরোধ, পাশাপাশি সীমান্তে অবস্থিত প্রাচীন মন্দির ধ্বংসাবশেষের মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব। উভয় দেশই ঐতিহাসিক মানচিত্রের ভিন্ন ব্যাখ্যা উপস্থাপন করে নিজেদের দাবি দৃঢ় করে তুলছে।
দুই পক্ষই একে অপরকে নতুন আক্রমণের দায়ী করে তুলেছে এবং বেসামরিক নাগরিকের ওপর আক্রমণের অভিযোগে একে অপরকে নিন্দা করেছে। জুলাই মাসে পাঁচ দিনের সংঘর্ষে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল, যা বর্তমান উত্তেজনার পটভূমি গঠন করেছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া তীব্র হয়েছে। চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, আঞ্চলিক সংস্থা ASEAN-এর চেয়ারম্যানে মালয়েশিয়া এবং জাতিসংঘ সকলেই অবিলম্বে অস্ত্রবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। এই দেশগুলো ও সংস্থাগুলি শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য দ্বিপাক্ষিক আলোচনার গুরুত্ব তুলে ধরেছে।
ASEAN সদস্য দেশগুলোর পররাষ্ট্র মন্ত্রীগণ সোমবার কুয়ালালামপুরে একত্রিত হয়ে এই সীমান্ত সংঘর্ষ নিয়ে আলোচনা করবেন। বৈঠকে থাইল্যান্ড ও ক্যাম্বোডিয়ার কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা শান্তি বজায় রাখতে প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলো নিয়ে মতবিনিময় করবেন এবং ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নির্ধারণের চেষ্টা করবেন।
এই বৈঠকের ফলাফল আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন। সীমান্তে চলমান যুদ্ধের ফলে বাণিজ্যিক রুট ও পর্যটন শিল্পে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সামগ্রিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করবে।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে, শরণার্থীদের মধ্যে বিশেষত নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। স্কুল বন্ধ, স্বাস্থ্যসেবা সুবিধার অভাব এবং মৌলিক খাবারের ঘাটতি তাদের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবিক সাহায্যকারী গোষ্ঠী দ্রুত সহায়তা পৌঁছানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সংঘর্ষের অবসান না হওয়া পর্যন্ত ক্যাম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডের জনগণকে নিরাপদ আশ্রয় ও মৌলিক সেবা নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অন্যতম অগ্রাধিকার রয়ে যাবে। শান্তি চুক্তি ও সীমান্ত নির্ধারণের পুনর্বিবেচনা ভবিষ্যতে এমন ধরনের সংঘর্ষের পুনরাবৃত্তি রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।



