কক্সবাজার থেকে ঢাকা যাত্রা করা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার সানজিদ ইমরান, হোটেল চেক‑আউটের পর শেষ নগদ ব্যবহার করে ঢাকা‑দিকের বাসে চড়েন। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রয়োজনে নগদ সংগ্রহের কোনো বাধা থাকবে না, এবং ঢাকায় নগদ‑বিহীন জীবন ইতিমধ্যে স্বাভাবিক।
বসটি চট্টগ্রামের একটি সার্ভিস স্টেশনে থামার সময়, সানজিদের পেটের গর্জন বাড়ল এবং তিনি নিকটস্থ স্টলগুলোতে স্ন্যাকসের সন্ধান করলেন। তবে সেখানে কোনো এটিএম, কোনো বিকাশ বা নগদ‑এজেন্ট, QR কোডের স্টিকার দেখা গেল না; সব বিক্রেতা নগদে পেমেন্ট গ্রহণ করছিলেন, যা বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির স্বাভাবিক দৃশ্য।
এই অভিজ্ঞতা তাকে উপলব্ধি করাল যে, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রচার সত্ত্বেও গ্রামীণ বাজারের এক কোণায় নগদই একমাত্র পেমেন্ট মাধ্যম। একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয় লক্ষ লক্ষ মানুষ, যাঁরা নগদ‑বিহীন লেনদেনের স্বপ্নকে বাস্তবতার সঙ্গে তুলনা করে দেখেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৩ সালে ঘোষণা করেছিল, ২০২৭ সালের মধ্যে মোট লেনদেনের ৭৫ শতাংশ ডিজিটাল হতে হবে। এই লক্ষ্য ভারতের ইউপিআই এবং চীনের আলিপে, উইচ্যাট পে মত সফল মডেলের অনুকরণে নির্ধারিত হয়েছিল, যদিও ভুটান ও নেপালও তুলনামূলকভাবে ছোট অর্থনীতিতে ডিজিটালাইজেশন এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
তবে বাংলাদেশে ডিজিটাল লেনদেনের পথে অবকাঠামোগত ঘাটতি, অনিয়মিত ইন্টারনেট সংযোগ, ব্যাংকের অনিচ্ছা, ব্যবহারকারীর অবিশ্বাস এবং প্রণোদনার অভাবের মতো বাধা রয়েছে। এসব কারণ একত্রে নগদ ব্যবহারের প্রবণতাকে দৃঢ় করে রাখে এবং লক্ষ্য অর্জনে বাধা সৃষ্টি করে।
ব্রেকথ্রু প্রত্যাশা সত্ত্বেও, লক্ষ্য অর্জনের জন্য অবশিষ্ট সময় মাত্র এক বছর ও অর্ধেকের কম। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করলে, ৭৫ শতাংশ ডিজিটাল লেনদেনের লক্ষ্য বাস্তবায়ন এখন কঠিন বলে মনে হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান উদ্যোগগুলো—বিনিময়, বাংলা QR এবং টাকাপে—ডিজিটাল অর্থনীতির ভিত্তি গড়ার জন্য চালু করা হয়েছিল। তবে বাস্তবে এই প্ল্যাটফর্মগুলো গ্রামীণ বাজার ও নগরী স্ট্রিট কোণায় নগদ‑বিহীন পেমেন্টের বিকল্প হিসেবে যথেষ্ট কার্যকর হয়নি।
বিনিময় সিস্টেমের লক্ষ্য ছিল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ত্বরিত তহবিল স্থানান্তর সহজ করা, কিন্তু সীমিত ইন্টারনেট ও ব্যবহারকারীর জ্ঞান ঘাটতির কারণে এর গ্রহণযোগ্যতা কমে গেছে। বাংলা QR কোডের প্রচারেও স্টল ও ছোট ব্যবসায়ীর কাছে যথেষ্ট সচেতনতা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা না থাকায় প্রভাব সীমিত।
টাকাপে, যা মোবাইল পেমেন্টের নতুন মডেল হিসেবে পরিচিত, তা কিছু শহুরে ব্যবহারকারীকে আকৃষ্ট করেছে, তবে গ্রামীণ এলাকায় এর বিস্তার এখনও ধীর। এই সব উদ্যোগের সমন্বয় সত্ত্বেও নগদ‑বিহীন লেনদেনের কাঠামো গড়ে তোলার জন্য আরও শক্তিশালী নীতি, অবকাঠামো ও ব্যবহারকারী শিক্ষার প্রয়োজন।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে, নগদ‑বিহীন লেনদেনের অগ্রগতি ধীর হলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, ই‑কমার্সের বৃদ্ধি এবং কর সংগ্রহে প্রভাব পড়তে পারে। এছাড়া, ডিজিটাল পেমেন্টের নিরাপত্তা ও ডেটা সুরক্ষার বিষয়েও ঝুঁকি বাড়বে, যা ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা বাড়াবে।
সংক্ষেপে, বাংলাদেশে ডিজিটাল লেনদেনের লক্ষ্য অর্জনের পথে অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও ব্যবহারকারীর আস্থার উন্নতি জরুরি। সরকার ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রণোদনা বাড়াতে হবে, গ্রামীণ এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগ স্থিতিশীল করতে হবে এবং ব্যবহারকারী শিক্ষার মাধ্যমে নগদ‑বিহীন পেমেন্টের সুবিধা তুলে ধরতে হবে। এভাবে ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রকল্পের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপান্তর করা সম্ভব হবে।



