১৮ ডিসেম্বর রাতে ঢাকা শহরে দুইটি প্রধান সংবাদমাধ্যমের অফিসে হিংসাত্মক আক্রমণ ঘটেছে। প্রথম আলো এবং দ্য ডেইলি স্টারের সদর দফতর ভাঙচুরের শিকার হয়ে আগুনে পুড়ে গিয়েছে, ফলে উভয় সংস্থার অনলাইন সেবা তৎক্ষণাৎ বন্ধ হয়ে যায়। একই সময়ে, সংবাদকর্মীরা নতুন সংখ্যা প্রস্তুত করার জন্য অফিসের ভিতরে আতঙ্কে কাঁপছিলেন, যখন বাহিরে হামলাকারীরা উল্লসিত চিৎকারে পরিবেশকে গুঞ্জন করছিল।
আক্রমণকারী গোষ্ঠীটি প্রথমে প্রথম আলোর অফিসে প্রবেশ করে সম্পূর্ণ ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, এরপর দ্য ডেইলি স্টারের অফিসে একই রকম হিংসা ও দহন করে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকজন সদস্য দ্রুতই সরে যায়, ফলে কোনো প্রতিরোধের সুযোগ না পেয়ে ভবনগুলো দ্রুতই ছাই হয়ে যায়। দু’টি সংস্থার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বন্ধ হওয়ায় পরের দিন কোনো সংবাদপত্রই প্রকাশিত হয়নি।
এই ঘটনার পটভূমিতে গত বছরের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে উল্লেখ করা যায়, যখন শীর্ষ পর্যায়ের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের পতনের পর জনগণ স্বাধীন মতপ্রকাশের নতুন যুগের স্বপ্ন দেখেছিল। তবে ১৮ ডিসেম্বরের এই আক্রমণ সেই স্বপ্নকে কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে ধাক্কা দিল।
গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে কিছু উগ্র দক্ষিণপন্থী গোষ্ঠী প্রথম আলোর বিরোধে পরিকল্পিত প্রচার ও হিংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে। বিশেষ করে গত বছরের নভেম্বর মাসে, একটি দল গরু জবাই করে ‘জেয়াফত’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করে প্রথম আলোর অফিসের সামনে, যা কয়েক দিন ধরে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করে। এই গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মিডিয়া সংস্থাগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগও বাড়ছে।
সম্প্রতি একটি দুঃখজনক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এই প্রেক্ষাপট যুক্ত হয়েছে। জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক এবং ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি, যিনি প্রথম আলোর বিরোধী প্রচারণার লক্ষ্যবস্তু ছিলেন, তার মৃত্যুর পর তিনি একবার নিম্নলিখিত কথা বলেছিলেন: “প্রথম আলোর সামনে যারা দাঁড়িয়েছে, আমরা তাদের পক্ষে দাঁড়িয়েছি? আমরা বলি, না! আপনি পারলে বিকল্প আরও দশটা প্রথম আলো তৈরি করেন। তার অফিসের সামনে আপনার কাজটা কী?” তার এই বক্তব্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল সত্তা প্রকাশ পেয়েছে, তবে তার মৃত্যুর পর তার নামকে ব্যবহার করে বিভিন্ন গোষ্ঠী জনমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে।
এই আক্রমণ এবং তার পরবর্তী ঘটনাগুলি দেশের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার ওপর গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা সংস্থার দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং ভবিষ্যতে মিডিয়া সংস্থার সুরক্ষার জন্য কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজন স্পষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে, যদি এই ধরনের হিংসা অব্যাহত থাকে, তবে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অধিকন্তু, এই ঘটনার পর মিডিয়া কর্মীরা এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন ও পর্যবেক্ষণের আহ্বান জানিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে, প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারের অনলাইন সেবার পুনরায় চালু হওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর উপস্থিতি দেশের গণমাধ্যমের স্বাস্থ্যের পুনরুদ্ধারের মূল চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



