১৯ ডিসেম্বর ১৯৮৮ রাতে স্কটল্যান্ডের ডামফ্রিস ও গ্যালোয়ে শহরে প্যান আম ১০৩ বিমান বিস্ফোরিত হয়ে ২৫৯ যাত্রী-সেবক এবং মাটিতে ১১ জনের প্রাণ হারায়। এই ভয়াবহ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত স্বেচ্ছাসেবক রেডিও অপারেটরদের কাজ আজ ৩৭ বছর পরও স্মরণীয়।
অ্যান ও রস ক্যাম্পবেল দম্পতি, তাদের গৃহে প্রস্তুত ‘গো-ব্যাগ’ নিয়ে, স্কটল্যান্ডের আইরশায় রেডিও অ্যামেচারস’ ইমার্জেন্সি নেটওয়ার্ক (Raynet) এর সদস্য ছিলেন। ১৯৫৩ সালের নর্থ সি বন্যার পর গঠিত এই স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্কের মূল লক্ষ্য ছিল বড় আকারের দুর্যোগে লাইসেন্সধারী রেডিও অপারেটরদের মাধ্যমে জরুরি যোগাযোগ নিশ্চিত করা।
লকার্বি ধ্বংসের খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় নিয়ন্ত্রক তাদেরকে কল করে জানায়, “আপনারা লকার্বি জন্য স্ট্যান্ডবাইয়ে থাকবেন”। অ্যান, রস এবং তাদের সহকর্মী টম স্টুয়ার্ট ও উইলিয়াম জেমিসন, সকলেই ২০-৩০ বছর বয়সের তরুণ রেডিও উত্সাহী ছিলেন এবং আইরশায় Rayraynet শাখার সক্রিয় সদস্য।
রস উল্লেখ করেন, “আমরা কাউন্সিলের রেস ও প্রশিক্ষণ কাজে নিয়মিত অংশ নিই, তবে সবসময় মনে রাখি যে কোনো সময় বড় কোনো জরুরি পরিস্থিতি আসতে পারে”। তবে লকার্বি ধ্বংসের মতো বিশাল ঘটনার কথা তারা কখনো কল্পনা করেননি।
বোমা বিস্ফোরণের ফলে বিমানটি আকাশে ধ্বংস হয়ে গিয়ে গ্রামটির উপরে ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে দেয়। এই ধ্বংসাবশেষের মধ্যে থেকে বেঁচে থাকা মানুষ ও মৃতদেহ উদ্ধার করতে শত শত স্বেচ্ছাসেবক现场ে পৌঁছায়, যার মধ্যে Raynet এর বহু সদস্যও ছিলেন। তাদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও সরঞ্জাম জরুরি যোগাযোগের অভাবে বড় সহায়তা করে।
সেই সময়ে স্কটল্যান্ডের বিভিন্ন পুলিশ বিভাগ ও অ্যাম্বুলেন্স সেবা প্রত্যেকের নিজস্ব রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করত, ফলে একে অপরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা কঠিন ছিল। রস ব্যাখ্যা করেন, “স্ট্রাথক্লাইড পুলিশ, ডামফ্রিস ও গ্যালোয়ে পুলিশ, এবং অ্যাম্বুলেন্স সবই আলাদা ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করত, তাই সমন্বয় করা কঠিন হয়ে পড়ে”।
প্রতিটি অনুসন্ধান দলকে একটি Raynet অপারেটর যুক্ত করা হয়, যিনি লকার্বি একাডেমি-এ অবস্থিত দুর্যোগ নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সঙ্গে রেডিও মাধ্যমে তথ্য আদানপ্রদান করেন। এই অপারেটররা অনুসন্ধান কুকুর, বিমান দুর্ঘটনা তদন্ত দল এবং অন্যান্য জরুরি সেবার সঙ্গে সমন্বয় রক্ষা করে, ফলে উদ্ধার কাজ দ্রুততর হয়।
লকার্বি ধ্বংসের পরপরই আন্তর্জাতিক তদন্ত শুরু হয়। ১৯৯১ সালে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ তদন্তে বোমা বিস্ফোরণের দায়িত্বে লিবিয়ার নাগরিক আবদেলবাসিত আল-মেগরাইহি নামের এক ব্যক্তি চিহ্নিত হয়। ২০০১ সালে গ্লাসগো উচ্চ আদালতে তাকে ২২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
মেগরাইহির আপিল ২০০২ সালে প্রত্যাখ্যান করা হয়, তবে ২০০৯ সালে মানবিক কারণে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। তার মুক্তি ও পরবর্তী সময়ে লকার্বি ধ্বংসের পুনরায় তদন্তের বিষয়টি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
বছরের পর বছর, শিকারী পরিবার ও বেঁচে থাকা লোকজনের ক্ষতিপূরণ ও ন্যায়বিচার দাবি অব্যাহত রয়েছে। ২০১৯ সালে যুক্তরাজ্য সরকার একটি নতুন তদন্ত কমিশন গঠন করে, যা ধ্বংসের কারণ, নিরাপত্তা ত্রুটি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার দিকগুলো পুনরায় বিশ্লেষণ করে।
এই সবের মাঝেও Raynet স্বেচ্ছাসেবকদের অবদান কখনো অগ্রাহ্য হয়নি। ২০২৫ সালে তাদের মধ্যে কয়েকজন, যার মধ্যে অ্যান ও রস ক্যাম্পবেলও অন্তর্ভুক্ত, তাদের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি শেয়ার করেন। তারা বলেন, “সেই রাতের কাজ আমাদের জীবনের সবচেয়ে কঠিন, তবে একই সঙ্গে সবচেয়ে গর্বের মুহূর্ত ছিল”।
আজও Raynet এর স্বেচ্ছাসেবকরা দেশের বিভিন্ন দুর্যোগে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে, এবং লকার্বি ধ্বংসের স্মৃতি তাদের সেবার অগ্রাধিকারকে দৃঢ় করে। এই ঘটনাটি দেখায় যে, স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্কের সঠিক প্রস্তুতি ও সমন্বয় কিভাবে মানবিক সংকটের সময় জীবন রক্ষা করতে পারে।
লকার্বি ধ্বংসের ৩৭ বছর পর, স্বেচ্ছাসেবকদের এই স্মরণীয় অবদান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে রয়ে গেছে।



