বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ. মনসুর গত শনিবার চট্টগ্রাম নগরীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় দেশের সব বন্দর ও বিমানবন্দরে রিয়েল‑টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস) সিস্টেম চালু করার পরিকল্পনা জানালেন। এই পদক্ষেপের লক্ষ্য আমদানি‑রপ্তানি লেনদেনের গতি বৃদ্ধি, পেমেন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় দেশের অবস্থান শক্তিশালী করা।
গভর্নর উল্লেখ করেন, আরটিজিএস সিস্টেমের মাধ্যমে লেনদেনের সময়সীমা কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক মিনিটে কমে যাবে, ফলে রপ্তানিকারক ও আমদানিকারক উভয়েরই নগদ প্রবাহে স্বচ্ছতা ও দ্রুততা আসবে। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত পেমেন্ট নিশ্চিত করতে পারবে, যা সরবরাহ শৃঙ্খলের বাধা হ্রাস করে উৎপাদন ও রপ্তানি ক্ষমতা বাড়াবে। এছাড়া, রিয়েল‑টাইম পেমেন্টের সুবিধা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি হ্রাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে কাজ করবে।
একই সভায় কক্সবাজারকে দেশের প্রথম ক্যাশলেস জেলা হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগের কথা জানানো হয়। ক্যাশলেস অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে প্রত্যেক নাগরিকের হাতে ছয় থেকে সাত হাজার টাকার মধ্যে স্মার্টফোন থাকা আবশ্যক বলে জোর দেওয়া হয়। এই প্রযুক্তিগত প্রয়োজনীয়তা পূরণে সরকারী ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রত্যাশিত, যাতে নগদ লেনদেনের পরিবর্তে ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার বাড়ে।
প্রান্তিক ও গ্রামীণ এলাকায় নারী এজেন্ট নিয়োগের মাধ্যমে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা বিস্তারের পরিকল্পনাও উপস্থাপিত হয়। নারী এজেন্টের উপস্থিতি স্থানীয় নারীদের আর্থিক সেবা গ্রহণে সহায়তা করবে, পাশাপাশি লিঙ্গ সমতা ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির দিক থেকে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এই উদ্যোগের ফলে গ্রামীণ বাজারে লেনদেনের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে, যা স্থানীয় ব্যবসার বিকাশে সহায়ক হবে।
সভায় চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন বণিক সমিতি, চেম্বার, বন্দর ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের পাশাপাশি শিক্ষক, অর্থনীতিবিদ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তার অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যায়। উপস্থিতদের মধ্যে তপশিলি ব্যাংকের আঞ্চলিক প্রধান ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিও ছিলেন, যা আলোচনাকে বহুমুখী দৃষ্টিকোণ থেকে সমৃদ্ধ করেছে।
গভর্নর চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সিঙ্গাপুর, দুবাই ও হংকংয়ের মতো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক কেন্দ্রের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দেন। তিনি উল্লেখ করেন, এই ধরনের কানেক্টিভিটি অঞ্চলকে লজিস্টিক্স হাব হিসেবে গড়ে তুলতে এবং রপ্তানি-নির্ভর শিল্পের জন্য নতুন বাজার উন্মুক্ত করতে সহায়ক হবে।
চট্টগ্রামকে দেশের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করে, ড. আহসান এইচ. মনসুর বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের অব্যবহৃত তহবিলকে চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপযুক্ত গ্রাহকদের মধ্যে পুনর্বণ্টন করা প্রয়োজন। এই তহবিলের সঠিক ব্যবহার স্থানীয় শিল্প, বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই) এর জন্য ক্রেডিট সহজলভ্য করবে, যা উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করবে।
সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের চট্টগ্রাম অফিসের নির্বাহী পরিচালক মকবুল হোসেনের সভাপতিত্বে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মাহমুদ আব্দুল মতিন ভূঁইয়া ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের নির্বাহী পরিচালক মো. খসরু পারভেজ গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল আমিন চট্টগ্রাম অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আঞ্চলিক ভূমিকা নিয়ে একটি ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন, যেখানে আরটিজিএস, ক্যাশলেস জেলা এবং পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের ব্যবহারকে মূল কৌশল হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
এইসব উদ্যোগের সমন্বয় চট্টগ্রাম ও সমগ্র দেশের বাণিজ্যিক পরিবেশকে আধুনিকায়ন, লেনদেনের স্বচ্ছতা ও গতি বৃদ্ধি, এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার দিকে অগ্রসর করবে বলে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন। বিশেষত, আরটিজিএস সিস্টেমের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং ক্যাশলেস জেলা প্রকল্পের সফলতা দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ভবিষ্যতে আরটিজিএস সিস্টেমের বিস্তৃত ব্যবহার, স্মার্টফোনের অধিকতর প্রবেশ এবং নারী এজেন্টের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে চট্টগ্রাম অঞ্চল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কে আরও সংযুক্ত হবে, যা রপ্তানি বৃদ্ধির পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়তা করবে। তবে, স্মার্টফোনের প্রাপ্যতা ও ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়াতে সরকারী ও বেসরকারি সেক্টরের সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা থাকবে, যাতে ক্যাশলেস অর্থনীতির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো যায়।



