বাংলাদেশের অফশোর তেল‑গ্যাস অনুসন্ধানে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর আগ্রহ হ্রাসের পেছনে একাধিক কাঠামোগত ও নীতিগত বাধা চিহ্নিত হয়েছে। মূল কারণগুলোতে প্রফিট‑শেয়ার মার্জিনের কমে যাওয়া, জরিপ তথ্যের ঘাটতি, ডব্লিউপিপিএফ (ওয়ার্কারস প্রফিট শেয়ারিং ফান্ড) শেয়ারিং সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা এবং উচ্চ মূল্যের ভূতাত্ত্বিক ডেটা সংগ্রহ অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া গভীর সমুদ্র থেকে স্থলভাগে গ্যাস পরিবহনের অতিরিক্ত হুইলিং চার্জ এবং দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগের ইচ্ছাকে প্রভাবিত করছে।
বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী ডব্লিউপিপিএফে অবদান রাখার বাধ্যবাধকতা বহুজাতিক সংস্থাগুলোর জন্য বিশেষভাবে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বাধ্যবাধকতা নিয়ে কোম্পানিগুলো সরকারকে শর্তসাপেক্ষে সমঝোতা চায়, যা এখনও সমাধান হয়নি।
অফশোর তেল‑গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য সরকার সম্প্রতি একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটির প্রধান হিসেবে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মহসিন নিযুক্ত হয়েছেন। কমিটিকে ড্রাফট অফশোর মডেল প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি) ২০২৫‑এর সামগ্রিক পর্যালোচনা ও সুপারিশ প্রস্তুত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পেট্রোবাংলা পূর্বে ড্রাফট পিএসসি ২০২৫ চূড়ান্ত করে, যেখানে আন্তর্জাতিক তেল‑গ্যাস সংস্থাগুলোর অংশগ্রহণ বাড়াতে গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ, পাইপলাইন ব্যয়ের পুনরুদ্ধার এবং কাজের বাধ্যবাধকতা সংক্রান্ত বড় সংস্কার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তবে বাস্তবায়নের সময় কাঠামোগত সমস্যাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান উল্লেখ করেন, সাতটি বিদেশি কোম্পানি দরপত্রের নথি ক্রয় করে হলেও প্রকৃতপক্ষে অংশগ্রহণ করেনি। ফলে দরপত্র পুনর্বিবেচনা এবং নতুন প্রস্তুতির কাজ এখনো চলমান। তিনি বলেন, দরপত্রের সময়সীমা মেনে না চলার ফলে দেশীয় এলএনজি আমদানিকারক গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এই দেরি দেশের স্বার্থকেও প্রভাবিত করেছে।
ড. মোস্তাফিজুরের মতে, ডব্লিউপিপিএফে নির্দিষ্ট হারে অবদান রাখার বাধ্যবাধকতা বিবেচনা করে বৈদেশিক মুদ্রায় বিনিয়োগের কার্যকর পদ্ধতি সম্পর্কে স্পষ্ট নীতি নির্দেশনা প্রয়োজন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, দেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য এই বিষয়গুলোতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
অফশোর অনুসন্ধানে আরেকটি সীমাবদ্ধতা হল রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি বাপেক্সের কেবলমাত্র স্থলভাগে কূপ খননের সক্ষমতা। বাপেক্সের অফশোর ড্রিলিং ক্ষমতা না থাকায় বহুজাতিক সংস্থাগুলোকে স্বতন্ত্রভাবে প্রকল্প চালাতে হয়, যা অতিরিক্ত আর্থিক ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
এইসব বাধা সত্ত্বেও সরকার অফশোর তেল‑গ্যাস অনুসন্ধানকে অগ্রাধিকার দিতে চায়, কারণ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে কাঠামোগত ও নীতিগত সমস্যাগুলো সমাধান না হলে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বাধা তৈরি হবে এবং তেল‑গ্যাস সম্পদের ব্যবহারিকতা সীমিত থাকবে।
কমিটির কাজের ফলাফল এবং পিএসসি ২০২৫‑এর চূড়ান্ত সংস্কার কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা দেশের জ্বালানি বাজারের দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষজ্ঞরা আশাবাদী যে, স্পষ্ট নীতি নির্দেশনা এবং ডব্লিউপিপিএফ সংক্রান্ত সমঝোতা অর্জিত হলে বহুজাতিক সংস্থাগুলোর অংশগ্রহণ পুনরায় বাড়তে পারে এবং অফশোর তেল‑গ্যাস প্রকল্পগুলো দ্রুত অগ্রসর হতে পারবে।
সারসংক্ষেপে, বহুজাতিক তেল‑গ্যাস কোম্পানিগুলোর আগ্রহ হ্রাসের মূল কারণগুলো কাঠামোগত মুনাফা ভাগ, তথ্যের ঘাটতি, শ্রম আইন অনুযায়ী ফান্ড শেয়ারিং এবং উচ্চ ব্যয়। সরকার গঠনকৃত কমিটি এবং সংশোধিত পিএসসি নীতিমালা এই বাধাগুলো দূর করে বিদেশি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে কাজ করছে। ভবিষ্যতে এই নীতিগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।



